আইন আছে প্রয়োগ নাই

আইন আছে প্রয়োগ নাই

স্টাফ রিপোর্টার: আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া উন্নত সমাজ গঠন করা সম্ভব না। আর উন্নত সমাজই পারে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু  দুঃখ জনক হলেও সত্য উন্নত সমাজ গঠনে দেশে যথেষ্ট আইন থাকলেও তার প্রয়োগ হচ্ছেনা। অথবা দুর্বল প্রয়োগ হচ্ছে।

ফলে প্রতি নিয়ত সামাজিক বিশৃংখলা বেড়েই চলছে। অথচ সাধারণ মানুষকে আইনগুলো সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি প্রয়োগ করা হলে একদিকে যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা সম্ভব তেমনি সভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠায় দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

এই আইন গুলোর  মধ্যে রয়েছে,কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি অসদাচরণ, ওজনে কম দেওয়া ও পণ্যের দাম বেি নেওয়া, শব্দ দূষণ,পলিথিন ব্যবহার, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং ও ফিটনেস, প্রকাশ্যে ধূমপান, ঘুষ সংক্রান্ত এবং আইনশৃংখলা বাহিনী ও প্রশাসনের দুর্বলতা। এই আইনগুলো প্রয়োগে গড়িমসির কারণে উন্নত সমাজ গড়া অসম্ভব অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কয়েক দিন আগে বগুড়া শহরের টিনপট্টি এলাকার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম ফতেহ আলী বাজার থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে ২ কেজি ওজনের একটি রুই মাছ কেনেন।

তবে মাছের ওজন নিয়ে কিছুটা সন্দেহ হওয়ায় তিনি বাজারেরই পরিচিত অন্য একটি দোকানে গিয়ে পুনরায় সেটি মেপে দেখেন মাছের ওজন আসলে ১ কেজি ৮০০ গ্রাম। অর্থাৎ তাকে ২০০ গ্রাম মাছ কম দেওয়া হয়েছে। ভালোভাবে খেয়াল করে সাইদুল বুঝতে পারেন, মাছের পলিথিনের ব্যাগে কৌশলে অতিরিক্ত পানি ভরে দোকানি ওজনে এই কারচুপি করেছেন। শুধু সাইদুল নন, ফতেহ আলী বাজারসহ শহরের বিভিন্ন বাজারে শত শত ক্রেতা এভাবে নিজের অজান্তেই ওজনে কম, অতিরিক্ত মূল্য কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন।

জনস্বার্থ, ভোক্তা অধিকার ও নাগরিক শৃঙ্খলা রক্ষায় দেশে বহু কঠোর আইন কার্যকর থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর নিয়মিত প্রয়োগ ও তদারকি না থাকায় নাগরিক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি থেকে শুরু করে শহরের বুকে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, তীব্র শব্দদূষণ, নিষিদ্ধ পলিথিনের অবাধ ব্যবহার, যেখানে-সেখানে ধুমপান, ঘুষ, দুর্নীতি এমনকি কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর মানসিক নির্যাতনের মতো অপরাধ ঘটছে।

তবে বিষয়গুলো এতো ছোটো মনে হয় যে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতেও সংকোচবোধ করেন। ভোক্তা অধিকার আইনের তোয়াক্কা না করে বাজারে যেমন পলিথিনের ব্যাগে পানি ভরে ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহারও চলছে দেদারসে। দুই যুগ সময় ধরে আইনত নিষিদ্ধ হলেও ফতেহ আলী বাজারসহ শহরের প্রতিটি কাঁচাবাজারে পলিথিনের অবাধ সরবরাহ রয়েছে। এসব বর্জ্য শহরের ড্রেন ও নালাগুলোতে জমে সামান্য বৃষ্টিতেই কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।

বাজারের এই বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি বগুড়া শহরের প্রধান সড়কগুলোতে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে নাগরিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সাধারণ পথচারী ও জরুরি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। একই চিত্র দেখা যায় শহরের শেরপুর রোড ও ঠনঠনিয়া এলাকার ক্লিনিকপাড়া হিসেবে পরিচিত সড়কগুলোতে। সেখানে বড় বড় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা না থাকায় বা তা খালি রাখায়, চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা মূল সড়কেই সারিবদ্ধভাবে গাড়ি পার্কিং করে রাখছেন।

এছাড়া শহরের অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত জলেশ্বরীতলাতেও শপিংমল ও রেস্টুরেন্টগুলোর সামনে প্রধান সড়কে যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং করে কোচিংসহ কেনাকাটা চলে। যানজটের সঙ্গে শহরের আরেকটি বড় সংকট তীব্র শব্দদূষণ।

ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করে চালকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সামনেও উচ্চশব্দের হাইড্রোলিক হর্ন বাজাচ্ছেন। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা কাগজে-কলমে থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ নেই। এর বাইরে আরেকটি নীরব অপরাধের শিকার হচ্ছেন নারীরা। কর্মক্ষেত্রে অনেক নারী মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের শিকার হলেও লোকলজ্জা ও চাকরি হারানোর ভয়ে তারা মুখ খুলছেন না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ‘অভিযোগ সেল’ কার্যকর নেই।

নাগরিকদের অভিযোগ, এই প্রতিটি খাতের অনিয়মের পেছনে জড়িয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ ও দুর্নীতি। সরকারি বা বেসরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে পদে পদে হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল তদারকির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক দেবাশীষ রায়ের সঙ্গে কথা বললে তিনি দৈনিক করতোয়া’কে জানান, প্রায় প্রতিদিনই তারা বগুড়া শহরের বাজারগুলোসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে থেকে জরিমানাও আদায় করা হচ্ছে। তারপরেও এই ছোট ছোট অপরাধগুলো থামছে না। ব্যক্তিগতভাবে পণ্য কিনে কোনো ব্যক্তি যদি ঠকেন তবে তিনি লিখিত বা মৌখিক দুইভাবেই অভিযোগ করতে পারেন। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করে অভিযোগ প্রমানিত হলে জরিমানার একটি অংশ ওই অভিযোগকারী পান।

এই ব্যাপারে বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এড. আব্দুল বাছেদ দৈনিক করতোয়া’কে বলেন, আইনের অভাব বাংলাদেশে কোনো বড় সমস্যা নয়, মূল সমস্যা হলো আইনের পক্ষপাতহীন ও নিয়মিত প্রয়োগের অভাব।

কেবল মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বা সাময়িক জরিমানা করে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট দূর করা সম্ভব নয়। স্থায়ী তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করে, এসব আইন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন আরও বাড়বে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/184872