গ্রিন ইকোনমি: টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান সংকটের প্রেক্ষাপটে, তখন একটি শব্দ বহুল আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতি। গ্রিন ইকোনমি এখন সময়ের দাবি। গ্রিন ইকোনমি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বুঝায়, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় পরিবেশকে ক্ষতি না করে। এখানে সামাজিক কল্যাণ, পরিবেশ সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার,পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা, জৈব কৃষি, টেকসই বনায়ন এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহার -এসবই গ্রিন ইকোনমির মূল স্তম্ভ। ভবিষ্যৎ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে গ্রিন ইকোনোমির বিকল্প নেই।
গ্রিন ইকোনমির মূল ক্ষেত্রসমূহ ও সমস্যাগুলো হলো:-
নবায়নযোগ্য জ্বালানি : বাংলাদেশে গ্রিন ইকোনমির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান সৌরশক্তি ব্যবহারের জন্য অনুকূল। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সৌর হোম সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বায়োগ্যাস, বায়ুশক্তি এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগ বেশি প্রয়োজন হয়। যেটা আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কঠিন। তার উপর প্রযুক্তির ঘাটতি, দক্ষ জনবল, সুষ্ঠু পরিকল্পনা তো আছেই। তবে যতদ্রুত সম্ভব জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনা জরুরি। নাহয় জীবাশ্মজ্বালানি ফুরিয়ে যাবে।
পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও গ্রিন বিল্ডিং : গ্রিন বিল্ডিং হলো এমন একটি ভবন যেটি তৈরি করার সময় এমন ভাবে তৈরা করা হয় যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে জ্বালানি ও সম্পদ সাশ্রয় করে। এখানে নবায়নযোগ্য ও সৌরশক্তি ব্যবহার হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এলইডি লাইট ব্যবহার হয়, বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা হয়, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হয়, বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয় এবং ছাদে নানা ধরনের গাছপালা লাগানো হয়। গ্রিন ইকোনমিকে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হলেও এখনো আমাদের দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বেশি দেখা যায়। পোশাক কারখানা গ্রিন হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অন্যান্য শিল্প কারখানা (যেমন: চামড়া, ডাইং, প্লাস্টিক) মারাত্মকভাবে নদী ও পরিবেশ দূষণ করছে। যেটি পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বাংলাদেশের শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকায় প্রতিদিন তায়া হাজার হাজার টন ময়লা তৈরি হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় দিনশেষে এগুলো যায় কোনো না কোনো খালে বা জলাশয়ে। ফলাফল দেখা যায় নদী দূষণ, জলজ প্রাণীর মৃত্যু। আবার প্লাস্টিক, পলিথিন যত্রতত্র ফেলার ফলে হালকা বর্ষনেই দেখা দেয় নগর বন্যা। সুতরাং পরিবেশের ভারসাম্য রাখার জন্য সঠিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে পরিবেশ দূষণ কমানো দরকার। টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা: টেকসই পরিবহন হলো এমন একটি পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও বায়ু দূষণ কমায়, এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমায়। এটি সবার জন্য নিরাপদ। এর মূল মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে মেট্রো রেল বা বৈদ্যুতিক বাস, সাইকেল চালানো বা হাঁটা। টেকসই পরিবহনের জন্য দূরপাল্লার পরিবহনে সড়কপথের ওপর চাপ কমিয়ে সাশ্রয়ী নৌপথ ও রেলপথের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তাহলে সড়ক পথে যানজট কমবে। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ও ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণও কমবে।
টেকসই কৃষি ও বনায়ন : টেকসই কৃষি ও বনায়ন হলো এমনব্যবস্থা যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকাজ করা হয়। টেকসই কৃষিতে পরিবেশেবান্ধব জৈব সার, কীটনাশক ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হয়। অন্যদিকে, টেকসই বনায়নের মাধ্যমে বন সংরক্ষণ, নতুন গাছ লাগানো, বন উজাড় রোধ, সামাজিক বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। টেকসই কৃষি ও বনায়ন গ্রিন ইকোনমির অন্যতম ভিত্তি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি কেননা এটি একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করে।
গ্রিন ইকোনোমি কোনো বিলাসিতা নয় বরং টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলার অপরিহার্য পথ। কারণ পরিবেশ ধবংস করে যে উন্নয়ন হয় সেটা সাময়িক এবং তা ঘনিয়ে আনে চরম বিপর্যয়। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ দেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই বাংলাদেশের জন্য গ্রিন ইকোনমি অপরিহার্য। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলক করতে হবে, সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, গণপরিবহন ও রেলপথ সম্প্রসারণ করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি এসব কঠোরভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হবে। তাহলেই আগামীতে একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে উঠবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ইডেন মহিলা কলেজ
Khadijatulkhurshedkhushi@gmail.com