গুনাহে কি মন ভারাক্রান্ত, জেনে নিন কোন নামাজে সব পাপ ক্ষমা হয়?

গুনাহে কি মন ভারাক্রান্ত, জেনে নিন কোন নামাজে সব পাপ ক্ষমা হয়?

প্রতিনিয়ত ভুল-ত্রুটি আর শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে গুনাহ বা পাপকাজ করে ফেলা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা। তবে একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—অন্যায় করার পর তার হৃদয়ে আফসোসের আগুন জ্বলে ওঠে, মনটা ভারী হয়ে যায়। এই অনুশোচনা আর আফসোসই হলো তার খাঁটি ইমানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমার সৎকাজ তোমাকে আনন্দ দেবে এবং তোমার পাপ তোমাকে কষ্টে নিপতিত করবে, তখন তুমি বুঝে নেবে তুমি একজন প্রকৃত মুমিন।’ (মুসনাদে আহমাদ ২২১৬৬, মুসতাদরাকে হাকেম ৩৩)

পাপের বোঝার সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে দুহাত পেতে হাজির হন। কারণ গাফুরুর রাহিম আল্লাহ তাআলা ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার আর কেউ নেই। বান্দা যখন সুন্দর করে অজু করে সালাতে দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে তওবা করে, তখন মহান আল্লাহ তার সব গুনাহ ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেন।

তওবার নামাজ: পাপ মোচনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম

গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ আমলটিই হলো— সালাতুত তওবা বা তাওবার নামাজ। এটি আদায়ের মাধ্যমে বান্দা অত্যন্ত দ্রুত আল্লাহর ক্ষমা লাভ করতে পারে।

হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا مِنْ عَبْدٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ ثُمَّ يَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلاَّ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ

‘কোনো বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে ফেলে, অতঃপর উত্তমরূপে অজু করে দাঁড়ায় এবং দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে—আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (আবু দাউদ ১৫২১, তিরমিজি ৪০৬)

হাদিসটিতে বর্ণিত আমলটির কথা উল্লেখ করে নবীজি (সা.) কুরআনের একটি পরম আশার বাণী তিলওয়াত করেন—

وَمَن يَعْمَلْ سُوءًا أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا

‘যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে ফেলে বা নিজের প্রতি জুলুম করে বসে, তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়— সে অবশ্যই আল্লাহকে অতি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু হিসেবে পাবে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১১০)

অজু ও নামাজের অলৌকিক ফজিলত

মনোযোগ দিয়ে করা প্রতিটি অজু ও সিজদা মুমিনের সম্মান বৃদ্ধি করে এবং পাপ ধুয়ে ফেলে। এ সম্পর্কে আরও দুটি চমৎকার সুসংবাদ হাদিসে এসেছে—

১. জান্নাত ওয়াজিব হওয়ার সুসংবাদ

مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ، ثُمَّ يَقُومُ فَيُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ مُقْبِلًا عَلَيْهِمَا بِقَلْبِهِ وَوَجْهِهِ، إِلاَّ وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ

‘যে মুসলিম সুন্দর করে অজু করে এবং অজুর পর একনিষ্ঠ মন ও আন্তরিকতা নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে—তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।’ (মুসলিম ২৩৪)

২. প্রতিটি সিজদায় গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি

হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে লক্ষ্য করে বলেছেন—

عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلَّهِ، فَإِنَّكَ لاَ تَسْجُدُ لِلَّهِ سَجْدَةً إِلاَّ رَفَعَكَ اللَّهُ بِهَا دَرَجَةً، وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً

‘জেনে রাখো, তোমার প্রতিটি সিজদার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তোমার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং একটি গুনাহ মিটিয়ে দেবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ ২২২০, মুসলিম ৪৮৮)

বিপদ ও অনুশোচনায় নামাজকে মাধ্যম বানানো

মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, জীবন সংগ্রামের যেকোনো কঠিন পথ কিংবা ভুলের অনুশোচনায় সে কেবল পরম করুণাময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য চায়। আর এই সাহায্য চাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো নামাজ। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের নির্দেশ দিয়ে বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য চাও; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৩)

ভুল করা মানুষের স্বভাবজাত হলেও সেই ভুলের সাগরে ডুবে না থেকে দ্রুত রবের দরবারে ফিরে আসাই হলো আসল বুদ্ধিমত্তা। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আসুন আমরা সুন্দরভাবে অজু করে দুই রাকাত তওবার নামাজে দাঁড়িয়ে যাই এবং নিজেদের অপরাধের জন্য চোখের পানি ফেলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের পাপ থেকে পবিত্র থাকার এবং নামাজের মাধ্যমে তার প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/184442