তিস্তা মেগা প্রকল্পঃ উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন ও বিপ্লবের নীলনকশা

তিস্তা মেগা প্রকল্পঃ উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন ও বিপ্লবের নীলনকশা

বাংলাদেশের ভৌগোলিক গঠন, সমৃদ্ধ কৃষি ব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রা নদ-নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। উত্তরবঙ্গের সেই উন্নয়ন– যাত্রায় তিস্তা নদী যুগ যুগ ধরে যেমন আশীর্বাদ, তেমনি কখনো কখনো অভিশাপও। বর্ষায় ভয়ংকর বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা-এই দুই চরম অবস্থাই এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। তিস্তা নদীপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, বন্যা-খরা মোকাবিলা, কৃষি উন্নয়ন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং নদী ভাঙন প্রতিরোধের জন্য প্রস্তাবিত একটি বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ হলো তিস্তা মেগা প্রকল্প। এটি উত্তরবঙ্গের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও পরিবেশ প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত টেকসই উন্নয়নের একটি জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্প। প্রকল্পটি শুধুমাত্র একটি নদী ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ নয় বরং এটি উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ। “তিস্তা মেগা প্রকল্প” বাস্তবায়নের গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য অপরিসীম। 

তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বঃ তিস্তা নদীর পানির ওপর রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী–সহ সমগ্র উত্তরাঞ্চলের কৃষি নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে, ফলে বোরো মৌসুম ও শীতকালীন সবজি উৎপাদন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সারা বছর সেচ–সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে, যা একাধিক ফসল উৎপাদনে সহায়তা করবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এটি হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি নদী-ভিত্তিক প্রকল্প নয়-বরং পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি। প্রতিবছর তিস্তা নদীর ভাঙনে হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়। জমি হারিয়ে মানুষ দারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়। তিস্তা মেগা প্রকল্পে নদীর দু’তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন এবং তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে নদী–ভাঙন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সমাধান দেবে। 

মানুষের জীবিকা–নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তরবঙ্গে বন্যা ও খরা উভয় অবস্থাই প্রকট হয়েছে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নেমে এসে প্লাবন সৃষ্টি হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিস্তা মেগা প্রকল্প নদীর পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নির্মাণ এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের জলবায়ু–ঝুঁকি ব্যাপকভাবে হ্রাস করবে। তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তাঃ তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এর ওপর নির্ভর করে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি। এই নদীর টেকসই ব্যবস্থাপনা ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি-–নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশকে পানি ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী অবস্থানে আনতে তিস্তা প্রকল্প অপরিহার্য। বর্তমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা একটি জাতীয় চ্যালেঞ্জ। 

তিস্তা অববাহিকার ৭-৮টি জেলাই দেশের অন্যতম খাদ্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত। পর্যাপ্ত সেচ–নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে দীর্ঘমেয়াদী পানি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য, যা কেবল তিস্তা মেগা প্রকল্পই নিশ্চিত করতে পারে। রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক উন্নয়নের ফলে উত্তরবঙ্গ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, শিল্প সবক্ষেত্রেই এ অঞ্চলে উন্নয়ন ধীরগতিতে হয়েছে। তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কৃষি-শিল্প–পর্যটন সব খাতেই এক ধরনের উন্নয়ন–বিস্ফোরণ ঘটবে, যা আঞ্চলিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। তিস্তা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের তাৎপর্যঃ প্রকল্পটির কাজ চলাকালীন এবং বাস্তবায়নের পর-উভয় সময়েই বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। 

নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, সেচ প্রকল্প সম্প্রসারণ, মাছ চাষ, পর্যটন উন্নয়ন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প সব মিলিয়ে হাজার হাজার নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে। স্থানীয় অর্থনীতি হবে আরও গতিশীল। সারা বছর পানি–প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে এ অঞ্চলে কৃষি–ভিত্তিক শিল্প যেমন রাইস মিল, ফুড প্রসেসিং, কোল্ড স্টোরেজ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য শিল্প, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প দ্রুত গড়ে উঠবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। তিস্তা নদী খনন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নদীপথে পরিবহন সহজ হবে। মালামাল পরিবহন কম খরচে সম্ভব হবে। পাশাপাশি তীরের সৌন্দর্য, নদী-ভিত্তিক পর্যটন, ওয়াটারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট, রিসোর্ট ও ইকো–ট্যুরিজম উন্নয়ন মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

 সংরক্ষিত নদী অনেক বেশি জীববৈচিত্র্য বহন করে। তিস্তা মেগা প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করবে এবং মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করবে। একই সঙ্গে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায় বর্ষায় হঠাৎ বন্যার ঝুঁকিও কমে যাবে। যেহেতু তিস্তা নদী একটি আন্তঃসীমান্ত নদী, তাই পানি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি সিদ্ধান্তই কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তিস্তা ব্যবস্থাপনায় নিজস্ব সক্ষমতা ও উদ্যোগ প্রদর্শন করতে পারলে ভবিষ্যতে ভারত-বাংলাদেশ পানি আলোচনায় ইতিবাচক চাপ তৈরি হবে। ফলে আন্তর্জাতিক পানি কূটনীতিতেও বাংলাদেশ শক্তিশালী হবে। সর্বোপরি, তিস্তা মেগা প্রকল্প উত্তরবঙ্গের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ এবং সক্রিয় করে তুলবে। অর্থনৈতিক চক্র যত বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আয় তত বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রকল্পটি শুধু খরচ নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি রাজস্ব –উৎপাদক বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করবে।

সম্প্রতি পর্যায়ক্রমে তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে - “জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই” শ্লোগানে গণসমাবেশ, মানববন্ধন, ১১টি পয়েন্টে একযোগে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি, তিস্তা তীরবর্তী এলাকায় মশাল প্রজ্বলন, ঢাকার জনপ্রিয় ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-এ মানববন্ধন তিস্তা মেগা প্রকল্পকে উত্তরবঙ্গের জনগুরুত্বপূর্ণ এবং গণদাবী হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। তিস্তা মেগা প্রকল্প উত্তরবঙ্গের মানুষের বহুদিনের প্রত্যাশা। এর মাধ্যমে একটি পুরনো স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। সেই স্বপ্ন হচ্ছে  উন্নত, আধুনিক ও সমৃদ্ধ উত্তরবঙ্গ গঠনের স্বপ্ন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তিস্তা আর দুর্ভাগ্যের প্রতীক নয়, বরং হয়ে উঠবে সমৃদ্ধির আলো, উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু। 

লেখকঃ  প্রভাষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামী ইউনিভার্সিটি 
অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বাংলাদেশ ০১৭২২-০৭৯২৭১ 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/184227