কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতা পণ্য পরিবহনে সড়কের কাছে বাজার হারাচ্ছে রেলওয়ে
স্টাফ রিপোর্টার : গত দুই দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ের পণ্য পরিবহনের ওয়াগন কমলেও বেড়েছে যাত্রীবাহী বগি। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে রেলওয়ের সচল মালবাহী ওয়াগনের সংখ্যা (ফোর হুইলার্স হিসেবে) যেখানে ছিল ১৩ হাজার ২১৭টি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩৭৫টিতে। অর্থাৎ, ২০ বছরের ব্যবধানে রেলওয়ে থেকে ২ হাজার ৮৪২টি মালবাহী ওয়াগন কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) রেলওয়ের রোলিং স্টক সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এই চিত্র পাওয়া গেছে।
বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে ওয়াগন সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ওয়াগনের সংখ্যা ১২ হাজার ৪৪৩টিতে নেমে আসে। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি সর্বনিম্ন ৭ হাজার ১৩৪টিতে গিয়ে ঠেকে। পরবর্তীতে নতুন কিছু ওয়াগন কেনা হলেও ২০ বছর আগের তুলনায় তা আর বাড়েনি। বিপরীতে, এই একই সময়ে রেলের যাত্রীবাহী বগি ১ হাজার ৩৪৭টি থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ২ হাজার ৮৬৯টিতে উন্নীত হয়েছে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রেলওয়ের মূল আয়ের উৎস পণ্য পরিবহন হলেও বিগত বেশ কিছু বছর ধরে কেবল যাত্রীবাহী খাতের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। লাভজনক ওয়াগন বহরের আধুনিকায়ন ও নতুন ওয়াগন যুক্ত না করায় রেলওয়ে পণ্য পরিবহনের বড় বাজারটি সড়কপথের কাছে হারিয়েছে। এখন সেই জায়গাটি দখল করে নিয়েছে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন পণ্য পরিবহনকারী সংস্থা।
খুবই অল্প সময়ে এবং নির্দিষ্ট গ্রাহকের বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সেবা সড়কপথের বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট সংস্থাগুলি করছে। এদিকে পর্যাপ্ত ওয়াগনের অভাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি ও সার পরিবহনে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক ব্যবসা ও সরবরাহ চেইনকে ব্যয়বহুল করে তুলছে।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়াগন কমে যাওয়ার প্রধান কারণ পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক স্ক্র্যাপ (পরিত্যক্ত ঘোষণা ও কেটে ফেলা) করা। রেলের সিংহভাগ মালবাহী ওয়াগন ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের তৈরি, যেগুলোর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) বহু বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে।
দুর্ঘটনা এড়াতে ও ট্রেন পরিচালন নিরাপদ রাখতে প্রতি বছর নিয়ম মেনে এসব পুরনো ওয়াগন স্থায়ীভাবে অবসরে পাঠানো বা স্ক্র্যাপ করা হয়। তবে কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতায় যেভাবে প্রতি বছর শত শত ওয়াগন বাতিল হয়েছে, সে অনুপাতে নতুন ওয়াগন কেনার জন্য বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদী মেগা প্রজেক্ট নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতি বছরই সচল ওয়াগনের বহর ছোট হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানান, ওয়াগন কমে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তারমধ্যে একটি কারণ হলো কোনো ওয়াগন বিকল হলে সেটা আর মেরামত বা ওই জায়গায় নতুন কোনো ওয়াগন কেনা হয়নি। এছাড়া রেলপথে পণ্য পরিবহনের চেয়ে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। অন্তবর্তী সরকারের সময় রেলের পশ্চিমাঞ্চল জোনের পক্ষ বেশ কিছু ওয়াগন কেনার জন্য চাহিদা দেওয়া হয়েছিলো।
কারণ নতুন ওয়াগন যোগ করলে রংপুর সীমান্ত দিয়ে বালি ও পাথর পরিবহনে সুবিধা হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া যাত্রীসেবা বাড়ানোর জন্য বিগত বছরগুলোতে নতুন কোচ বা বগি কেনার ওপর অনেক বেশি চাপ ছিল। সেই তুলনায় মালবাহী খাতের দিকে নজর কম দেওয়া হয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/183980