প্রেম-রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমা বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট
যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোনিবেশ নিশ্চিত করতে কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা-নাটক নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে।
আজ রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটকে প্রেম ও অতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের অবাধ নির্মাণ ও সম্প্রচার যুবসমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব কনটেন্টে পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার ও ধর্ষণের মতো বিষয়কে স্বাভাবিক বা মহিমান্বিত করে উপস্থাপনের অভিযোগও করা হয়েছে।
রিটকারীর দাবি, এ ধরনের কনটেন্টের প্রভাবে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। একইসঙ্গে সমাজের প্রচলিত নৈতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য বাড়ছে বলেও রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিটে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও গবেষণার বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, লাগামহীন রোমান্টিক ও উসকানিমূলক কনটেন্ট যুবসমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং নারীর প্রতি সহিংসতা ও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। রিটকারী আইনজীবী যুক্তি দিয়েছেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হলেও শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের মাধ্যমে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রয়েছে। জননৈতিকতা বিনষ্টকারী বা সামাজিক অপরাধে প্ররোচনা দেয়—এমন কনটেন্ট অবাধ সম্প্রচার সাংবিধানিক সুরক্ষার আওতায় পড়তে পারে না বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে রিটে বলা হয়েছে, জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। রিট আবেদনে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’-এর ৫(২) ও ৮(১) ধারার উল্লেখ করে বলা হয়েছে, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষা এবং এর পরিপন্থী কনটেন্টের অনুমোদন না দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে। একইভাবে ‘কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬’-এর ১৯ ও ২০ ধারার উল্লেখ করে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং যুবসমাজের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, এমন সম্প্রচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে রিটে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ব্যর্থতাকে প্রশাসনিক অবহেলা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন আবেদনকারী।
রিটে শুধু প্রেমভিত্তিক কনটেন্ট নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশনাই নয়, যুবসমাজের সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেম বিকাশে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারিরও আবেদন জানানো হয়েছে।
এর আগে একই বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে গত ২৭ আগস্ট সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের আইনি নোটিশ (ডিমান্ডিং জাস্টিস নোটিশ) পাঠানো হয়েছিল। নোটিশের পরও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেয়ায় জনস্বার্থে ও জাতীয় সংস্কৃতি রক্ষার লক্ষ্যে হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করা হয়েছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/183520