সরকারের সমালোচনা করুন, তবে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা নয়: আবদুস সালাম

সরকারের সমালোচনা করুন, তবে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা নয়: আবদুস সালাম

সরকারের ভুল-ত্রুটির সমালোচনা করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব। তবে সমালোচনার পাশাপাশি সরকারের যাত্রাপথে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে দেশকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

শনিবার রাধানীর কাকরাইলের আইডিবি ভবনে দা ডেইলি বাংলাদেশ ডাইরির ৫ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আবদুস সালাম বলেন, সাংবাদিকতা সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংবাদপত্রকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি ও সমাজের প্রতি সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা ছিল। সমাজের অনিয়ম ও ত্রুটি তুলে ধরে সমালোচনার মাধ্যমে তাঁরা সমাজকে সঠিক পথে নিতে ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশ ডায়রির পঞ্চম বর্ষপূর্তিতে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ড. আসাদুজ্জামান খান কবি, গীতিকার ও গায়ক। একজন শিল্পীমনা মানুষ দেশকে সুন্দরভাবে দেখেন এবং সেভাবেই দেশকে সাজাতে চান। তাঁর মতো মানুষ সংবাদপত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেটি আরও পরিপূর্ণতা পায়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আবদুস সালাম বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পার হলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে দেশ পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৯ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা নতুন করে শুরু হয়েছে। এই যাত্রা যাতে ব্যাহত না হয় এবং দেশ আবার গণতন্ত্রের পথ থেকে ছিটকে না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

বর্তমান সরকারের চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, সমস্যাসংকুল একটি দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ছিল না। গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারও ছিল না। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের সমস্যার পাশাপাশি ব্যাংক খাতেও সংকট ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ও সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এমন পরিস্থিতিতে সরকার সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে। সব সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন।

আবদুস সালাম বলেন, দীর্ঘ ১৭ থেকে ১৯ বছর গ্যাসকূপ খনন করা হয়নি। এখন নতুন করে গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুতের সমস্যা সমাধানে সৌরবিদ্যুতের দিকে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। অতীতে বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগের বিষয়টিও সবাই জানেন। এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক সমালোচনা করতে হবে। তবে সরকারের যাত্রাপথে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা উচিত নয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কীভাবে এসব সমস্যার সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সরকারকে ইতিবাচক পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন।

ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় নগর ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল। ব্যাটারিচালিত রিকশা, হকার ও জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় পদ্ধতিগত উন্নয়ন হয়নি। অনেক ড্রেনও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের উপযোগিতা হারিয়েছে। ফলে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট ও গ্রিন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটিকে চারটি ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এক এলাকার রিকশা যাতে অন্য এলাকায় যেতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হবে। নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার রিকশা ঢাকায় প্রবেশ ঠেকানোর পাশাপাশি রিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে।

হকারদের বিষয়ে তিনি বলেন, রাজপথ বা মানুষের চলাচলের জায়গায় হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে শুক্র ও শনিবার নির্দিষ্ট সড়কে এবং অফিস সময়ের পর বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অফিসপাড়ার নির্দিষ্ট জায়গায় তাঁদের বসার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। হকারদেরও নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, তিন মাসের কর্মসূচি শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বাড়ি, আঙিনা, ছাদ ও পাশের ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না।

ঢাকার পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সকাল ছয়টা থেকে আটটা পর্যন্ত শহর ঘুরলে অনেক জায়গায় ময়লা দেখা যায় না। কিন্তু মানুষ রাস্তায় বের হওয়ার পর ধীরে ধীরে সেখানে আবর্জনা জমে। নাগরিকেরা সচেতন হয়ে রাস্তায় টিস্যু, বোতলসহ অন্য আবর্জনা না ফেললে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবদুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছেন। এই গাছ কারও ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে নয়, সবার স্বার্থে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতি থেকে বাঁচতে এবং অক্সিজেন পেতে গাছ লাগানোর বিকল্প নেই।

সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংবাদপত্রের মালিকদের জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশ আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে এবং ঢাকা একটি পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীতে পরিণত হবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/183415