কিংবদন্তি অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের জন্মদিন আজ
বিনোদন ডেস্ক : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনের কিংবদন্তি অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান - এটিএম শামসুজ্জামানের জন্মদিন আজ। ১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বেঁচে থাকলে আজ ৮৫ বছরে পা রাখতেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন এটিএম শামসুজ্জামান। খলনায়ক, কৌতুকাভিনেতা প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর ছাপ রেখেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনাতেও তাঁর ছিল অসামান্য দক্ষতা।
পুরান ঢাকার দেবেন্দ্রনাথ দাস লেন এলাকায় তাঁর শৈশব-কৈশোর কাটে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার পগোজ স্কুল, কলেজিয়েট স্কুল ও রাজশাহীর লোকনাথ হাই স্কুলে। ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর এটিএম জগন্নাথ কলেজে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
তাঁর বাবা নূরুজ্জামান ছিলেন নামকরা উকিল ও রাজনীতিবিদ। মা নুরুন্নেসা বেগম। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে এটিএম শামসুজ্জামান ছিলেন সবার বড়।
চলচ্চিত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নয়, বরং নির্মাণের কাজ দিয়ে। ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর ১৯৬৫ সালে অভিনয় শুরু করেন। তাঁর প্রথম অভিনীত চলচ্চিত্র ‘নয়া জিন্দেগানী’ হলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি।
মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রে প্রথম তাঁকে দেখা যায় ১৯৬৮ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে। এরপর ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’, ‘মলুয়া’ ও ‘বড় বউ’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘মলুয়া’ চলচ্চিত্রের সংলাপও লেখেন তিনি।
১৯৭১ সালে ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম কাহিনি ও চিত্রনাট্য লেখেন এটিএম শামসুজ্জামান। পরের বছর ১৯৭২ সালে অভিনয় করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ ও ‘লালন ফকির’-এ। ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রের জন্য বাচসাসের বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন তিনি।
১৯৭৫ সালে ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন এটিএম শামসুজ্জামান। এর পরের বছর ১৯৭৬ সালে আমজাদ হোসেনের ‘নয়নমণি’ ছবিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘অশিক্ষিত’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মোল্লা বাড়ির বউ’, ‘হাজার বছর ধরে’, ‘গেরিলা’ ও ‘চোরাবালি’সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি শতাধিক কাহিনি ও চিত্রনাট্যও লিখেছেন এই গুণী শিল্পী।
পরিচালক হিসেবেও এটিএম শামসুজ্জামানের অভিষেক ঘটে। ২০০৯ সালে ‘এবাদত’ চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন এটিএম শামসুজ্জামান। ‘দায়ী কে’, ‘ম্যাডাম ফুলি’, ‘চুড়িওয়ালা’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’ ও ‘চোরাবালি’—এই পাঁচ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। ২০১৫ সালে অর্জন করেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক। ২০১৭ সালে তাঁকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এটিএম শামসুজ্জামান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে এটিএম শামসুজ্জামানের অবদান অনস্বীকার্য। অভিনয়ের বৈচিত্র্য, সংলাপের স্বতন্ত্রতা এবং কাহিনি-চিত্রনাট্যে সৃজনশীলতার কারণে তিনি শুধু একজন অভিনেতা নন, বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম হয়ে আছেন। তাঁর বিস্তৃত কর্মভাণ্ডারই তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্থায়ী করে রেখেছে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/183190