জলবায়ুর অভিঘাতে কৃষি: এখনই বদলাতে হবে কৃষির কৌশল
বাংলাদেশের কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের একটি খাত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। স্বাধীনতার পর সীমিত জমিতে উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যব্যবস্থায় বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পেছনে কৃষকের শ্রমের পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের বীজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেই অর্জনের সামনে এখন নতুন ও ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ-জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও উপকূলীয় লবণাক্ততা কৃষির প্রচলিত ব্যবস্থাকে দিন দিন অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনকে আর ভবিষ্যতের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; কৃষকের মাঠে এর প্রভাব এখনস্পষ্ট।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা এই ঝুঁকিকে আরও গভীর করেছে। সরকারের বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও শুষ্ক মৌসুমের পানি সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান ২০২৩-২০৫০-এ কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তাকে জলবায়ু অভিযোজনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ঝুঁকির বিষয়টি নীতিনির্ধারণের পর্যায়েও স্বীকৃত। এখন মূল প্রশ্ন হলো সেই পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে মাঠে পৌঁছাচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কৃষির জন্য বিশেষ উদ্বেগের।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ১৯৮০ সালের পর বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নয়, ফসলের জীবনচক্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। ধানের ফুল ফোটা ও পরাগায়নের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা দানা গঠনে সমস্যাতৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণাতেও উচ্চ তাপমাত্রা, খরা, লবণাক্ততা, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো অজৈব চাপ মোকাবিলায় সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু ধান নয়, গম, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও অন্যান্য ফসলও তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ক্লাইমেট স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিস্থিতিতে গমের ফলন কমার আশঙ্কা এবং ডাল, তেলবীজ, সবজি ও পাটসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাবের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষির ঝুঁকি কোনো একটি ফসল বা একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। উপকূলীয় অঞ্চলের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি নদী, খাল ও কৃষিজমিতে প্রবেশ করলে মাটির গুণাগুণ ও সেচের পানির মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক নথিতে বাংলাদেশের উপকূলীয় ভূমির বড় অংশে লবণাক্ততার প্রভাব এবং ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় প্রচলিত ফসলের বদলে লবণসহিষ্ণু ফসল বেছে নেওয়া বা জমি পতিত রাখার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আবার খরা ও সেচের পানির ওপর চাপ বড় সমস্যা। পাহাড়ি অঞ্চলে অতিবৃষ্টি মাটির ওপরের উর্বর স্তর ধুয়ে নিয়ে যায়; নদীভাঙনে হারিয়ে যায় উৎপাদনশীল জমি। অর্থাৎ অঞ্চলভেদে সংকটের ধরন আলাদা হলেও আঘাতের কেন্দ্র কৃষিই। এই অভিঘাতের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন কৃষক।
ফসল নষ্ট হলে শুধু একটি মৌসুমের উৎপাদন হারায় না; কৃষকের বীজ, সার, সেচ ও শ্রমের খরচও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আয় কমে গেলে ঋণের চাপ বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে কৃষক বিকল্প পেশা বা অন্যত্র কাজের সন্ধানে যেতে বাধ্য হন। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পরিমাপের সময় শুধু কত টন ফসল নষ্ট হলো, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়; কৃষকের আয়, ঋণ, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সামনে সম্ভাবনাও রয়েছে। বিএনপি সরকার কর্তৃক গৃহিত কৃষি কার্ড ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫ হাজার কষককে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এবং ২০২৬- ২৭ অর্থবছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
মোকাবিলায় কৃষকদের বীমার আওতায় আনার উদ্যোগ ও রয়েছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। ব্রির বর্তমান তথ্যভান্ডারে খরা, জলমগ্নতা, লবণাক্ততা ও তাপসহিষ্ণু জাতের গবেষণার তথ্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জলবায়ু স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব উদ্ভাবন ও বিনিয়োগকে আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এ জন্য অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। উপকূলে লবণসহিষ্ণু জাত ও পানি ব্যবস্থাপনা, উত্তরাঞ্চলে খরাসহিষ্ণু ও স্বল্পমেয়াদি ফসল, হাওরে আগাম বন্যা বিবেচনায় ফসলের সময় নির্ধারণ এবং পাহাড়ে মাটির ক্ষয় রোধে সংরক্ষণমূলক কৃষি-এ ধরনের স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ফসল বহুমুখীকরণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি-সাশ্রয়ী সেচ, মালচিং, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবা ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস যদি কৃষকের কাছে সময়মতো ও সহজ ভাষায় পৌঁছে, তাহলে বীজ বপন, সেচ, কীটনাশক প্রয়োগ কিংবা ফসল কাটার সময় নির্ধারণেও ক্ষতি কমানো সম্ভব।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গবেষণা, নীতি ও মাঠপর্যায়ের মধ্যে সমন্বয়। কৃষি গবেষণাগারে সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবিত হবে, কিন্তু কৃষক যদি মানসম্মত বীজ না পান, প্রযুক্তির সুফল মিলবে না। আবহাওয়ার তথ্য তৈরি হবে, কিন্তু তা যদি কৃষকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযোগী না হয়, তবে তার কার্যকারিতাও সীমিত থাকবে। তাই কৃষি, পানি, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য সহজ অর্থায়ন, কৃষিবীমা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর ক্ষতি কতটা কমানো যাবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আমাদের প্রস্তুতির ওপর। কৃষিকে যদি শুধু উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে এখনই কৃষির কৌশল বদলাতে হবে। গবেষণা, প্রযুক্তি, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ুসহিষ্ণু জাত, কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা এবং কার্যকর সরকারি নীতির সমন্বয়ই পারে পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষিকে টিকিয়ে রাখতে। প্রকৃতির পরিবর্তন থামানোর ক্ষমতা আমাদের নেই; কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষির অভিযোজন ঘটানোর দায়িত্ব আমাদেরই।
লেখক: শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন এ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ
sirazammanira07@gmail.com