বগুড়ায় প্রতিদিন অটোরিকশার ভাড়ায় ব্যয় হয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা

বগুড়ায় প্রতিদিন অটোরিকশার ভাড়ায় ব্যয় হয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার: বগুড়ার মানুষ প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা রিকশা ভাড়া বাবদ ব্যয় করছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ৬০ হাজারের বেশি রিকশাচালক এই টাকা তুলে নিচ্ছে। রিকশার চাপ বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ হাটতে আগ্রহ হারাচ্ছে। কম দূরত্বেও মানুষ রিকশা ব্যবহার করছে। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের পকেট যেমন ফাঁকা হচ্ছে তেমনি শহরে যানজটও বাড়ছে পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে কমছে কৃষি শ্রমিক।

বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের একটি সূত্র মতে, একজন অটোরিক্সা চালক প্রতিদিন আয় করে থাকে ১০০০ টাকা থেকে ৯শ’ টাকা। সেই হিসেবে প্রতিদিন ৬০,০০০ রিক্সাচালকের গড় আয় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। ফলে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত বগুড়ায় দিন দিন বেড়েই চলেছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশার সংখ্যা। বর্তমানে শুধু বগুড়া মহানগরেই ৬০ হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করছে।

শহরের প্রাণচঞ্চল পরিবেশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের কারণে পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ এখানে আসেন। এই সুযোগে আশপাশের জেলা থেকে বেকার জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বগুড়ামুখী হচ্ছে এবং গ্যারেজ থেকে ভাড়া নিয়ে অথবা এনজিও ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাটারি চালিত রিকশা নামিয়ে দিচ্ছে শহরের রাস্তায়।

অটোরিকশা চালকদের দৈনিক গড় আয় ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় বেকার যুবসমাজ কৃষিকাজ ও অন্যান্য শারীরিক পরিশ্রমের কাজ ছেড়ে খুব সহজে এই পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর ফলে বগুড়ার আশপাশের জেলাগুলোতে তীব্র আকার ধারণ করেছে কৃষি শ্রমিকের সংকট। গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিকাজে যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বেকার সমস্যা সাময়িক দূর হলেও সামগ্রিক শ্রমবাজারে এটি দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।

৬০ হাজার অটোরিকশার এই বিশাল বহর টিকিয়ে রাখতে গিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর তৈরি হয়েছে অকল্পনীয় চাপ। প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি চার্জ দিতে খরচ হচ্ছে প্রচুর বিদ্যুৎ। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, শহরের বিভিন্ন অটোরিকশার গ্যারেজে দেদারছে ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ বৈদ্যুতিক লাইন। বিদ্যুৎ চুরির এই মহোৎসবের কারণে একদিকে যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে লোডশেডিং এবং গ্রিড বিপর্যয়ের মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে পুরো অঞ্চলের বিদ্যুৎ খাত।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, এখনই অটোরিকশার অতিরিক্ত বিস্তার রোধ করা জরুরি। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। এর মধ্যে এক বছরের জন্য আমদানি নিষেধাজ্ঞা, অটোরিকশা ও এর মোটর-ব্যাটারির মতো যন্ত্রাংশ আমদানি আগামী অন্তত এক বছরের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা।

খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও তা সীমিত করা, যাতে নতুন রিকশা কেনার প্রবণতা কমে যায়। মহানগরের ধারণক্ষমতা বিবেচনায় রিকশা সীমিতকরণ করতে হবে। শহরের রাস্তাঘাট ও ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা মাথায় রেখে রিকশার একটি নির্দিষ্ট কোটা নির্ধারণ করা।

অনেকের মতে, আমদানি ও যন্ত্রাংশ বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ খরচ সহনীয় পর্যায়ে আসবে, অন্যদিকে কৃষি খাতে শ্রমিক সংকট লাঘব হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর থেকে অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে। পরবর্তীতে দেশের বিদ্যুৎ ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনলে এটি পুনরায় চালুর কথা ভেবে দেখা যেতে পারে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/183129