সাড়ে ৫ বছরেও বগুড়ার ‘বাবা হুজুর’ হত্যাকান্ডের কূল কিনারা পেলনা পুলিশ
স্টাফ রিপোর্টার : তদন্তে কোন কূল-কিনারা না পেয়ে রহস্য উন্মোচনে ব্যর্থ হয়ে বগুড়ার বহুল আলোচিত মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে ‘বাবা হুজুর’ হত্যা মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের সাড়ে ৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়। সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই বগুড়ার ইন্সপেক্টর জাহিদ হোসেন সম্প্রতি আদালতে এ মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছেন।
তবে এই হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন না করে এবং হত্যাকান্ডে জড়িত ঘাতকদের শনাক্ত না করে মামলার চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করায় বাদি নিহতের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন আমি ন্যায় বিচার পেলাম না। তদন্তে পিবিআই এর তদন্ত কর্মকর্তা চরম গাফলতির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন এ রিপোর্ট মানতে পারছিনা। আমরা চাই হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসুক এবং প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়ুক। তিনি বলেন,আদালতে এ হত্যাকান্ডের চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিলের বিরুদ্ধে আদালতে দু’চারদিনের মধ্যে নারাজি আবেদন করবেন।
উল্লেখ্য, গত ২০২১ সালের ৪ মে সকাল পোনে ১০ টার দিকে বগুড়া মহানগর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বগুড়া-নাটোর সড়কে শাজাহানপুর উপজেলার বীরগ্রাম এলাকায় কৃষি কলেজের কাছে একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সার গতিরোধ করে সামনে থেকে গুলি করে হাফেজ মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে ‘বাবা হুজুর’কে হত্যা করা হয়। মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে ‘বাবা হুজুর’ (৫৬) নাটোরের সিংড়া উপজেলার সুকাশ নওদাপাড়ার গ্রামের মৃত সাইদুল আলমের ছেলে। তবে তিনি বগুড়া মহানগরের নিশিন্দারা কারবালা এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। বাড়ি ফেরার জন্য তিনি সিএনজি চালিত একটি অটোরিকশায় চেপে বগুড়া মহানগরে আসছিলেন।
তাকে বহনকারি অটোরিকশাটি বীরগ্রাম এলাকার কৃষি কলেজের সামনে পৌঁছুলে মোটর সাইকেযোগে দুই-তিনজন দুর্বৃত্ত এসে পথরোধ করে। এ সময় তারা কোন কথা না বলেই মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে ‘বাবা হজুর’কে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। প্রথম গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যায়। পরে ফের কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয় মোজ্জাফ্ফরকে লক্ষ্য করে। এ সময় একাধিক গুলি মোজ্জাফরের শরীরে লাগে। গুলি করে মোটরসাইকেলে চেপে পালিয়ে যায় দৃর্বৃত্তরা। ঘটনার পরপরই ওই সিএনজি অটোরিকশার যাত্রীরা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পথিমধ্যে মোজাফ্ফর হোসেন মারা যান।
উল্লেখ্য, তার দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী গ্রামের বাড়ি নাটোরের সিংড়ায় সুকাশ গ্রামে বসবাস করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বগুড়া মহানগরের নিশিন্দারা এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতেন।
অনলাইন জুয়া, পেশাগত বিষয়,জমি-জমা ও আর্থিক লেন-দেন ও নারীসহ নানা বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চললেও দীর্ঘদিনেও হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়নি। হত্যাকান্ডে ‘ভাড়াটে’ খুনিদের ব্যবহার করা হয়েছে বলে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করলেও তাদের শনাক্ত করা যায়নি।
নিহত মোজাফ্ফর হোসেনের ছোট ভাই মামলার বাদি সাইফুল ইসলাম বলেন, সাড়ে ৫ বছরে এ হত্যার রহস্য উন্মোচিত না হওয়া ও খুনিরা ধরা না পড়ায় তার পরিবার হতাশ। তার ধারণা, তার ভাইয়ের সাথে জমি-জমা নিয়ে বিরোধের জের ধরেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হতে পারে। এর আগে জমি-জমা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মোজাফ্ফরের ভগ্নিপতি হাবিবর রহমানকে খুন করা হয়।
পরে সেই খুনের মামলার ৩ নম্বর স্বাক্ষী ছিলেন তার ভাই নিহত মোজাফ্ফর হোসেন। এখন হাবিবর হত্যা মামলাটি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। মোজাফ্ফর হোসেন ছিলেন সেই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। কিন্তু আদালতে সাক্ষী দেয়ার ২ মাস আগেই পরিকল্পিতভাবে পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে তার ভাইকে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন ভাড়াটিয়া খুনিদের ব্যবহার করে তার ভাই মোজাফ্ফরকে হত্যা করা হতে পারে বলে তার ধারনা।
আরো উল্লেখ্য যে,২০১৪ সালে বগুড়া শহরের নিশিন্দারা ফকির উদ্দিন স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে ‘আল জামিয়া আল আরাবিয়া দারুল হেদায়া ক্বওমী মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন হাফেজ মোজাফ্ফর রহমান। ওই মাদ্রাসার একটি কক্ষে বসেই তিনি তাবিজ, কবচ, ঝাড়-ফুঁক দিয়ে কবিরাজী চিকিৎসা করতেন। ভক্তরা মোজাফ্ফর হোসেনকে ‘বাবা হুজুর’ নামে ডাকতেন। তিনি নারীর ভেঙ্গে যাওয়া সংসার জোড়া লাগানো,বন্ধ্যা নারীর বাচ্চা হওয়াসহ নানা বিষয়ে কবিরাজি করতেন। আইপিএল ক্রিকেটের অনলাইন জুয়ারুরাও তার কাছে আসতো। খেলায় বাজি ধরে খেলার রেজাল্ট জানতেও আসতো তারা।
মামলার বর্তমান তদন্তকারি কর্মকর্তা পিবিআই বগুড়ার ইন্সপেক্টর মো: জাহিদ হোসেন বলেন, সর্বশেষ তিনি মামলাটি তদন্ত করেছেন। এর আগে থানা ও ডিবি পুলিশ মামলাটি তদন্ত করেছে। গত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে দেয়া দেয়া হয়। পিবিআই বগুড়া ইন্সপেক্টর পদ মর্যাদার আরো এক কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। এরপর সর্বশেষ তাকে মামলাটি তদন্ত করতে দেয়া হয়। তিনি এ হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এ হত্যার ঘটনায় সন্দেহজনকভাবে আল আমিন নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তদন্তে তার সংলিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই হত্যার ঘটনা সত্য। তবে স্বাক্ষী প্রমান পাওয়া যায়নি। যে কারনে মামলাটির চুড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তথ্য ও স্বাক্ষী পেলে মামলাটি পুরুজ্জীবিত করা যাবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/182856