ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে লোডশেডিং

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ক্রমেই বাড়ছে লোডশেডিং

ঢাবি প্রতিনিধি : একসময় যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ছিল বিরল ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলে গেছে। তীব্র গরমের মধ্যে দিনে একাধিকবার এবং কখনো ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি ক্যান্টিনগুলোতে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে রান্নাবান্নাও। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, দৈনন্দিন জীবনযাপন ও সামগ্রিক আবাসিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ১০-১৫ দিনেও লোডশেডিং হতো না। কখনো বিদ্যুৎ চলে গেলেও তা কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হতো না। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনে ও রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখনো টানা এক ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রিডিং রুমে পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং হলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল, স্যার এ এফ রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী, ক্যান্টিন পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

ক্লাস চলাকালেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট : লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু আবাসিক হলেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক একাডেমিক ভবনেও নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে। ক্লাস চলাকালে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ হয়ে যায় প্রজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ও স্মার্ট ক্লাসের বিভিন্ন উপকরণ। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষের ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।

কলা অনুষদের শিক্ষার্থী সিফাত আহমেদ বলেন, বিভিন্ন বিভাগে এখন প্রেজেন্টেশননির্ভর ক্লাস নেওয়া হয়। কিন্তু ক্লাসের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো লেকচারই ব্যাহত হয়। বিশেষ করে দুপুরের ক্লাসে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ শুধু আরাম-আয়েশের বিষয় নয়। এটি শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম পূর্বশর্ত।’

‘পাঁচ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখিনি’ : শেখ মুজিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. নাহিদ আহমেদ বলেন, ‘গত পাঁচ বছরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন লোডশেডিং দেখিনি। আগে বিদ্যুৎ গেলে বুঝতাম কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছে। এখন প্রতিদিন দিনের মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। রিডিং রুমে বসে পড়া যায় না, রাতে পরীক্ষার প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে।’

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থী রিমি আক্তার।তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় তিন বছর ধরে হলে আছি। এই সময়ে যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া পাঁচ মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রিডিং রুমে কোনো বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই।’

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক জহির রায়হান রিপন বলেন, ‘যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ১০-১৫ দিনেও লোডশেডিং হতো না, হলেও কয়েক মিনিটের জন্য, সেখানে এখন প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। কখনো দিনে ও রাতে দুই-তিনবারও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে।’

তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার পাশাপাশি একাডেমিক পরিবেশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গ্যাস সংকটে ক্যান্টিনের রান্না ব্যাহত : বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে গ্যাসের তীব্র সংকট। হলগুলোর ক্যান্টিনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় নির্ধারিত সময়ে রান্না শেষ করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্যান্টিনে বিকল্প হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে রান্না করতে হচ্ছে। এতে রান্নার খরচও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ক্যান্টিন পরিচালকেরা।

শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিন পরিচালক ডালিম সরকার বলেন, ‘সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুরের খাবার—সবকিছুই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু গ্যাসের চাপ না থাকলে চুলা জ্বলে না। ফলে খাবার প্রস্তুত করতে অনেক বেশি সময় লাগে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখন সারা দেশের সমস্যা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব উদ্বেগজনক। আগেও বিদ্যুৎ সংকট ছিল, কিন্তু এত তীব্র ছিল না যে নিয়ম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে লোডশেডিং হবে।’ তিনি বলেন, ‘এখন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, রান্নাবান্না, এমনকি ন্যূনতম জীবনযাপনও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক হলের ক্যান্টিনে কাঠ দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে, ফলে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।’

এ পরিস্থিতিতে ডাকসুর পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে ক্যান্টিনগুলোর জন্য বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব ঢাবিতেও : এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। একই সময়ে প্রায় এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়েছে। শুরুতে ঢাকার বাইরে এর প্রভাব বেশি থাকলেও ১২ আগস্ট রাত থেকে ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতির সেই প্রভাব এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বুয়েট) পড়েছে।

বুয়েটেও দিনে পাঁচ ঘণ্টার লোডশেডিং : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়েও (বুয়েট) বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতির কারণে প্রতিদিন পাঁচ দফায় মোট পাঁচ ঘণ্টার নির্ধারিত লোডশেডিং কার্যকর করেছে বুয়েট কর্তৃপক্ষ। প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৭টা, সকাল ১০টা থেকে ১১টা, দুপুর ২টা থেকে ৩টা, রাত ১২টা থেকে ১টা এবং রাত ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/182539