বগুড়ায় কাচ্চির নামে চলছে রমরমা ব্যবসা
শহর প্রতিনিধি: মুখরোচক খাবার ‘কাচ্চি’। পুরান ঢাকার স্থানীয়দের রান্নাঘর থেকে আশপাশের গলি-মহল্লার রেস্তোরাঁ হয়ে ধীরে ধীরে নতুন ঢাকার রেস্তোরাঁতেও পৌঁছে গেছে খাবারটি। সময়ের পরিক্রমায় উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র ঝাল স্বাদের বগুড়ার ভোজন রসিকদের নাগালেও পৌঁছেছে মশলাদার এই পদ বিরিয়ানি। মহানগরের ঐতিহ্যবাহী খাবার হোটেলগুলোর পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শুধু এই একটি খাবারকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক আয়োজন।
বগুড়া মহানগরের ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলোর ভোক্তাদের খাদ্যতালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে কাচ্চি। গুণগত মান এবং বগুড়ার মানুষের রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় কাচ্চিতে যোগ হয়েছে আলাদা স্বাদ। বগুড়ার মানুষের রসনার সঙ্গে মিল রেখে প্রথা ভেঙে কাচ্চিতে যুক্ত হয়েছে গরুর মাংসও।
বগুড়া সাতমাথা থেকে স্টেশন রোডের প্রেসক্লাব ভবন পর্যন্ত মাত্র ৩০০ মিটারের মধ্যে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে পাঁচটি কাচ্চি বিক্রির দোকান। ‘কাচ্চি’ নামের সঙ্গে কেউ যুক্ত করেছেন ডাইন, রয়েল। কেউবা নামের শুরুতে হাজী, আবার কেউ শেষে যোগ করেছেন ডাইন শব্দটি।
সবাই বিক্রি করছেন মাংসের সঙ্গে এক পিস বড় আলু দিয়ে নির্ধারিত মাপের ফুল, হাফ ও কোয়ার্টার প্লেটের কাচ্চি। মহানগরের এডওয়ার্ড পার্ক রোডে রয়েছে নবাব কাচ্চিঘর। মফিজ পাগলার মোড় এলাকায় সাধারণ বাংলা হোটেলের মাঝে ভিন্ন ধরনের সাজসজ্জা ও চাকচিক্য নিয়ে গড়ে ওঠা ঢাকা বিরানি হাউজ নাম হলেও বিক্রি করছে কাচ্চিই। কিছু ব্যবসায়ী আবার ক্রেতা আকর্ষণে তাদের দোকানগুলোতে ‘১০০ টাকায় ১ প্লেট কাচ্চি’ শিরোনামে প্রচারণা চালাচ্ছে।
বগুড়া নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে এসে আশে পাশের দোকান থেকে কাচ্চি খেয়ে বেরিয়ে আসা একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বল্প মূল্যের এই মুখরোচক খাবারটি অনেকটা প্রলুব্ধ হয়েই খেয়েছেন তাঁরা। তবে অনেকেই বলেছেন, মশলাদার এই খাবারের দাম অনুযায়ী পরিমাণ ও মাংসের গুণগত মান নিয়ে তাঁদের সংশয় রয়েছে।
বন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে কাচ্চির আবদার মেটাতে মহানগরের নামি এক ব্র্যান্ডের কাচ্চি বিরিয়ানির দোকানে গিয়েছিলেন পুরান বগুড়ার মোস্তাফিজুর রহমান। তাঁর মূল্যায়ন ভিন্ন।
তিনি জানান, ৩২০ টাকায় যে এক প্লেট কাচ্চি দেওয়া হয়েছিল, তাতে ছিল দুই পিস খাসির মাংস আর এক পিস বড় আলু-পরিমাণে যথেষ্ট, অন্তত একজন মানুষের ভালোভাবে খাওয়ার মতো। অন্যদিকে সড়কের পাশের লোভনীয় কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিক্রি হওয়া কাচ্চির দাম, মান ও পরিমাণ তাঁর কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়েছে।
শেরপুর রোডে রয়েছে নান্না বিরিয়ানি হাউজ। ইয়াকুবিয়া স্কুল মোড়ে রয়েছে ঢাকার বিখ্যাত কাচ্চির চেইন শপের শাখা। সাতমাথা থেকে কাজী নজরুল ইসলাম সড়কে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড কাচ্চি বিরিয়ানি ও বাংলা খাবারের হোটেল।
মহানগরের ঐতিহ্যবাহী কোয়ালিটি ও আকবরিয়াও এখন বিক্রি করছে হালআমলের এই মুখরোচক দম বিরিয়ানি ‘কাচ্চি’, তবে দাম ও গুণগত মানে রয়েছে ভিন্নতা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু প্রতিষ্ঠানের নেই খাদ্য দোকানের নিবন্ধন, পরিবেশ কিংবা নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র।
মহানগরে বিভিন্ন প্রয়োজনে আশপাশের উপজেলা ও জেলা শহর থেকে আসা মানুষও এসব নামী-বেনামী হোটেল থেকে কিনে খাচ্ছেন কাচ্চি। স্বাদের সঙ্গে সুস্বাস্থ্যের মিল না থাকলেও বিকিকিনি চলছে হরদম। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কিংবা সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিদর্শকেরা মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও উপকরণের মান যাচাই করলেও বগুড়ায় তাঁদের চোখের সামনেই অনেকটা প্রকাশ্যে চলছে কাচ্চি ব্যবসার এই অনিয়ম।
মহানগরের ইয়াকুবিয়া মোড়ে ঢাকার বিখ্যাত এক কাচ্চি প্রতিষ্ঠানের বগুড়া শাখার কর্মকর্তা সাব্বির রহমান জানান, তাঁরা নির্ধারিত ৭০ গ্রাম ওজনের দুই পিস খাসির মাংস, এক পিস বড় আলু এবং বাসমতি চাল দিয়ে এক প্লেট ফুল কাচ্চি বিক্রি করেন ৩২০ টাকায়। শহরের অলিগলিতে কাচ্চির এমন তুঘলকি কাণ্ডে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি এম রেজাউল করিম সরকার রবিনও।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের ১৯৯৬ সালের ২৩ অক্টোবরের গেজেট অনুযায়ী হোটেল-রেস্তোরাঁর ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু বা নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট মালিক সমিতির ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বগুড়ায় এ নিয়ম মানার কোনো বাধ্যবাধকতা কার্যকর নেই। নামে-বেনামে কেবল ‘পুরান ঢাকা’ বা ‘ঢাকা’ শব্দ ব্যবহার করেই বগুড়ার সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এই সেবাধর্মী ব্যবসায় বিভিন্ন কাজে বগুড়ায় আসা আশপাশের ১৬টি জেলার মানুষও দামে, মানে ও স্বাদে প্রতারিত হচ্ছেন বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, প্রশাসনের সঠিক নজরদারি ও তদারকির মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী এই খাদ্যব্যবসার গুণগত মান ও ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব, পাশাপাশি ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়া থেকেও রক্ষা করা যাবে।
খাদ্য হিসেবে কাচ্চির গুণগত মান ও স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে জানতে চাইলে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মেহেদী হাসান লেমন বলেন, কাচ্চি বিরিয়ানি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো খাবার নয়, তবে এটি উচ্চ ক্যালোরি ও চর্বিযুক্ত একটি খাবার। তাই এটি খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণ, রান্নার উপকরণ এবং খাওয়ার সময়ের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/181736