কিশোর সুকান্তের স্বপ্ন

কিশোর সুকান্তের স্বপ্ন

ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা কি কখনো ভেবেছ, একজন কিশোরও কি এমন কবিতা লিখতে পারে যা বহু বছর পরেও মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাবে? যে বয়সে অনেকেই খেলাধুলা আর আনন্দে দিন কাটায়, সেই বয়সেই একজন কিশোর মানুষের দুঃখ, ক্ষুধা আর স্বপ্ন নিয়ে ভাবতেন। তাঁর নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য। সুকান্ত জন্মেছিলেন ১৫ আগস্ট ১৯২৬ সালে কলকাতার কালীঘাটে তাঁর মাতামহের বাড়িতে। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ার উনশিয়া গ্রামে। 

ছোটবেলা থেকেই বই পড়া ও লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। চারপাশের মানুষের জীবন তাঁকে খুব সহজেই ভাবিয়ে তুলত। কোনো শ্রমিক সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে, কোনো কৃষক ফসলের আশায় মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে, কোথাও আবার মানুষ খাবারের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে এসব দৃশ্য কিশোর সুকান্তের মনে দাগ কাটত। তখন পৃথিবীও ছিল অস্থির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়, দারিদ্র্য আর ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। রাস্তায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ দেখে সুকান্ত নিশ্চুপ থাকতে পারতেন না। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, পৃথিবীতে এত খাবার, এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেন না খেয়ে থাকবে? এই প্রশ্নই ধীরে ধীরে তাঁর কবিতার শক্তি হয়ে উঠল। 

সুকান্তের কাছে কবিতা শুধু ফুল, পাখি, চাঁদ কিংবা নদীর সৌন্দর্যের কথা বলার বিষয় ছিল না। তিনি মনে করতেন, মানুষের জীবনের সত্যও কবিতায় উঠে আসা দরকার। তাই তাঁর কবিতায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের কষ্ট এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন জায়গা করে নিল। কিশোর বয়সেই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। পরে তিনি কবিতা লেখার পাশাপাশি পত্রিকা সম্পাদনা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও যুক্ত হন। ১৯৪৪ সালে তাঁর সম্পাদনায় আকাল নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। 

তিনি কিশোরদের জন্য প্রকাশিত পত্রিকার সঙ্গেও কাজ করেছেন। অর্থাৎ লেখালেখি তাঁর কাছে শুধু নিজের আনন্দের বিষয় ছিল না, মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও একটি পথ ছিল। সুকান্তের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, ঘুম নেই, মিঠেকড়া, অভিযান ও হরতাল। তাঁর কবিতার মধ্যে হে মহাজীবন, রানার, আঠারো বছর বয়স, ছাড়পত্র, কৃষকের গানসহ অনেক রচনা আজও পাঠকের মনে জীবন্ত। তাঁর আঠারো বছর বয়স কবিতায় তরুণ বয়সের শক্তি ও স্বপ্নের কথা ধরা পড়েছে। রানার কবিতায় দেখা যায় ছুটে চলা এক শ্রমজীবী মানুষের জীবন। আর হে মহাজীবন কবিতায় বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য কবির কাব্যচিন্তার কেন্দ্রে উঠে আসে। তবে সুকান্ত শুধু কঠিন কথার কবি ছিলেন না।

শিশু-কিশোরদের জন্যও তিনি লিখেছেন। তাঁর মিঠেকড়া গ্রন্থে ছড়া ও কিশোরদের উপযোগী নানা রচনা রয়েছে। ফলে তাঁর সাহিত্যজগতে যেমন শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম আছে, তেমনি আছে শিশুমনের আনন্দ ও কৌতূহল কিশোর সুকান্তের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মানুষ ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না, যেখানে শ্রমের মর্যাদা থাকবে এবং মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে। তাঁর জীবন খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। 

মাত্র বিশ বছর বয়সে, ১৩ মে ১৯৪৭ সালে যক্ষ্মায় তাঁর মৃত্যু হয়। এত অল্প বয়সে চলে গেলেও তিনি বাংলা কবিতায় এমন একটি কণ্ঠ রেখে গেছেন, যা আজও শোনা যায়। ছোট্ট বন্ধুরা, সুকান্তের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বপ্ন দেখার জন্য বয়স বড় হওয়া দরকার নেই। একটি কিশোরের চোখেও পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার মতো বড় স্বপ্ন থাকতে পারে। তোমরা যখন কোনো অন্যায় দেখবে, কোনো মানুষের কষ্ট দেখবে, তখন হয়তো তোমাদের মনেও প্রশ্ন জাগবে। সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিতে পারে নতুন কোনো স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন একদিন হয়তো তোমাদের হাত ধরেই আরও সুন্দর পৃথিবীর পথে হাঁটবে।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/181675