নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ৯৫

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ৯৫

নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় পাহাড় ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো কয়েকশ পর্যটকসহ বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বুধবার (২৬ আগস্ট) বিভিন্ন ভিডিওতে বন্যার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

 

প্রবল স্রোতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকার ঘরবাড়ি, সড়ক ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে তিব্বতের গাইরং কাউন্টির একটি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রেও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

 

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছেন, ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের পর বরফধসের কারণে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্যোগের প্রকৃত কারণ জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।

নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাবে, দুর্গত এলাকা থেকে অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, তিনজন মার্কিন ও ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, দেশটির অন্তত আট নাগরিকেরও কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

নেপালের এক পুলিশ কর্মকর্তা দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার পর এখন পর্যন্ত ২২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে সীমান্ত এলাকার ভোটেকোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পানির স্রোতে কয়েকটি গ্রাম, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

নেপাল সরকারের মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল বলেন, দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনায় ভারত ও চীনের কাছে প্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

এদিকে নেপালের নদীগুলোর পানি ভারতের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

চীনের অংশে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদামাটি ও পানির স্রোত ধেয়ে আসার আগে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (জিএফজেড) জানিয়েছে, ওই ঘটনার প্রায় সাত মিনিট আগে এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিআইএমওডির প্রতিনিধি চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, লেন্দে নদীতে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীপথে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় উজানে ফের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড়ি জেলা রাসুয়ার সিয়াপ্রু বেসি ও তিমুরে এলাকায় নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও ঠিকমতো অবতরণ করতে পারছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েকটি গ্রাম পানিতে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকে জানান, নদীর পাশের বেশ কয়েকটি বসতি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাঁর নিজের পাঁচ আত্মীয়ও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। রাসুয়া জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পরিয়ার নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, নেপাল সীমান্তের কাছে শিগাতসে অঞ্চলের গাইরং বন্দরে ভূমিধসের কারণে যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

চীন ইতোমধ্যে ৫৭৪ জন উদ্ধারকারীকে ঘটনাস্থলের দিকে পাঠিয়েছে। তবে রাস্তায় প্রায় পাঁচ ফুট গভীর কাদা ও পলি জমে থাকায় উদ্ধারকারীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক অভিযান চালানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার বিপর্যয় ঠেকাতে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন।

নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ বা ৪৩০ মেগাওয়াট সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালকে সব ধরনের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। দুই দেশের উদ্ধারকর্মীরা সমন্বয়ের মাধ্যমে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

উল্লেখ্য, তিব্বত থেকে উৎপন্ন ভোতে কোশি নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে মিশে পরে ভারতে গান্ধক নদী নামে প্রবাহিত হয়েছে। গত বছরও তিব্বতের একটি হিমবাহসংলগ্ন হ্রদ ফেটে একই নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হন।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/181410