আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর সেনাপতিত্ব: এক রণকৌশলগত মূল্যায়ন
সাজিদ ওয়াসিক বাঁধন : ইতিহাসের মহান সেনানায়কদের সাধারণত যুদ্ধজয়, সামরিক কৌশল ও বিজয়ের পরিসর দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর সামরিক নেতৃত্বকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য দিয়ে বিচার করলে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন ধর্মীয় নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক, সংগঠক ও সেনাপতি। তাঁর সামরিক নেতৃত্বের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ছিল যুদ্ধকে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করা।
নবুয়তের ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে মক্কার নির্যাতন থেকে মদিনায় রাষ্ট্রগঠন, কুরাইশের সঙ্গে সংঘাত, বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং শেষ পর্যন্ত মক্কা বিজয় সব মিলিয়ে তিনি আরবের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আমূল পরিবর্তন করেন। মক্কা পর্বে শক্তির অভাবকে সামরিক সংঘাতে না নিয়ে তিনি সংগঠন, ধৈর্য ও সামাজিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। অর্থাৎ তাঁর প্রথম কৌশল ছিল শক্তির অভাবকে শক্তি দিয়ে মোকাবিলা নয়, বরং সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগানো।
মদিনায় এসে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে তাঁর সামরিক নেতৃত্বও নতুন মাত্রা পায়। বদরের বিজয়, উহুদের কঠিন শিক্ষা এবং খন্দকে পরিখা ব্যবহারের মতো ঘটনা দেখায় যে তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল পরিবর্তন করতে সক্ষম ছিলেন। বিশেষ করে খন্দকের প্রতিরক্ষামূলক কৌশল প্রমাণ করে, প্রচলিত যুদ্ধরীতির বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় সামরিক পদ্ধতি গ্রহণে তিনি বাস্তববাদী ছিলেন। তবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে নয়; যুদ্ধের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণেও। হুদায়বি-য়ার সন্ধি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তাৎক্ষণিকভাবে এটি আপস মনে হলেও শান্তির পরিবেশ মুসলিমদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ তাঁর কাছে বিজয় মানেই শত্রুকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত করা নয়; কখনো যুদ্ধ এড়িয়ে এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করাও বিজয়ের অংশ। মক্কা বিজয় এই দর্শনের আরও বড় উদাহরণ।
ব্যাপক রক্তপাতের পরিবর্তে আত্মসমর্পণের পথ উন্মুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া সামরিক বিজয়কে রাজনৈতিক পুনর্মিলনে রূপ দেয়। ফলে বিজয় কেবল ভূখন্ড দখলে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা নতুন রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছে। অবশ্য তাঁর সামরিক নেতৃত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সতর্কতাও জরুরি। সপ্তম শতকের আরবের গোত্রীয় সমাজকে আধুনিক 'গণঅভ্যুত্থান', 'অসম যুদ্ধ' বা সমসাময়িক সামরিক পরিভাষায় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। একইভাবে অবরোধ, দুর্গ দখল বা সম্পদ নিয়ন্ত্রণের মতো কৌশলকে সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কার বলাও ইতিহাসসম্মত নয়। তাঁর বিশেষত্ব ছিল বিদ্যমান সামরিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতিকে পরিবর্তিত আরব বাস্তবতার সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় করা। তাঁর নেতৃত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার। মদিনার রাষ্ট্র ছিল আধুনিক কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র নয়; স্থায়ী বিশাল সেনাবাহিনী বা সাম্রাজ্যিক রসদব্যবস্থাও ছিল না। তবু দ্রুতগতি, সংগঠন, তথ্য, কূটনীতি, আনুগত্য ও মনোবলকে কাজে লাগিয়ে তিনি সামরিক শক্তিকে কার্যকর করে তুলেছিলেন। উহুদ ও হুনাইনের মতো ঘটনাও দেখায় মহান নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকে; নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হলো বিপর্যয়ের পর বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে লক্ষ্যপথে ফিরিয়ে আনা।
সবশেষে বলা যায়, মুহাম্মদ (সা.)-এর সামরিক নেতৃত্বের মূল্যায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন 'তিনি কত যুদ্ধ জিতেছিলেন'এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, সীমিত সম্পদ নিয়ে তিনি কীভাবে একটি বিভক্ত গোত্রীয় সমাজকে একটি নতুন রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর অধীনে সংগঠিত করেছিলেন। তাঁর সামরিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যুদ্ধকে লক্ষ্য না বানিয়ে রাজনৈতিক ফলাফলের অধীন রাখা। যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয় সাময়িক হতে পারে; কিন্তু যুদ্ধের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়, সেটিই ইতিহাসকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে। এই দৃষ্টিতে মুহাম্মদ (সা.)-এর সামরিক জীবন শুধু যুদ্ধের ইতিহাস নয়-এটি একই সঙ্গে নেতৃত্ব, রাষ্ট্রগঠন, কূটনীতি ও একটি সমাজের গভীর রূপান্তরের ইতিহাস।
লেখক: আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক ০১৭১৬৩৮৯০০৮
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/181358