লালমনিরহাটে শিশু নন্দিনী হত্যা মামলার প্রধান আসামি বিধানের মৃত্যুদন্ড
লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের আদিতমারীতে সাত বছরের শিশু নন্দিনী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রধান আসামি বিধান চন্দ্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসাথে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করায় বিধানের মা মমতা রানী ও বাবা রনজিত কুমারকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিন মাসের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়।
দণ্ডিতরা আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের বাসিন্দা। আর হত্যার শিকার নন্দিনী রায় একই গ্রামের নলনী মোহনের মেয়ে। আজ রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে লালমনিরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হায়দার আলী এ রায় ঘোষণা করেন। চাঞ্চল্যকর এই মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গঠনের মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ায় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র এবং তার বাবা-মা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, গত ১৬ জুন বিকেল থেকে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় শিশু নন্দিনী। সারারাত খোঁজাখুঁজির পরদিন গত মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। পরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরে পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে আটক করতে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে পুলিশের সাথে স্থানীয়দের ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে। খবর পেয়ে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান ঘটনাস্থলে গেলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের বহরে হামলা চালায়।
এসময় সংঘর্ষে অন্তত ১৮ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। সরকারি ৫টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আদালতের রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহত নন্দিনীর বাবা ও মামলার বাদি নলনী মোহন বর্মন বলেন, যারা মামলা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাহায্য করেছেন, তাদের ধন্যবাদ জানাই।
পাশাপাশি দেশের আইন ব্যবস্থাকেও ধন্যবাদ জানাই। আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট প্রকাশ করে তিনি দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান। এর আগে, ১৬ জুন নিহত নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহন বাদি হয়ে বিধান চন্দ্রকে প্রধান করে তার বাবা রণজিৎ কুমার এবং মা মমতা রানীকে অভিযুক্ত করে আদিতমারী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার জবানবন্দিতে বিধান চন্দ্র হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।
এ হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনায় বিধান আদালতকে জানান, কয়েক বছর আগে তার মা মমতা রানী অন্যের সংসারে যাওয়ায় তাকে ডিভোর্স দেন তার বাবা রণজিৎ কুমার। এরপর দ্বিতীয় বিয়ে করেন রণজিৎ। কিন্তু কিছুদিন পরে বিধান আলোচনা করে মাকে তাদের সংসারে ফিরিয়ে আনেন। এতে ওই সমাজ থেকে তাদের একঘরে করা হয়। যা নিয়ে নন্দিনীর বাবা নলিনী মোহনের সাথে তাদের ঝগড়া বিবাদ হয়।
এতে ক্ষিপ্ত হন বিধান চন্দ্র। সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে নলিনীর পরিবারের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করতে থাকেন। দীর্ঘ এক বছর আগের ঝগড়ার ক্ষোভ মেটাতে কিছুদিন আগে নন্দিনীর বড় ভাই যোতিষ্ঠিকে পানিতে চুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু স্থানীয়দের কারণে সেটা করতে ব্যর্থ হন বিধান।
প্রতিশোধের দ্বিতীয় পরিকল্পনা মোতাবেক গত সোমবার বিকেলে নন্দিনী ও অপর এক শিশুকে নিয়ে বাড়ির উঠানে মোবাইল ফোনে টিকটক দেখছিলেন বিধান। এরপর অপর শিশুটি চলে গেলে তার মোবাইল ফোনে চার্জ শেষ হয়। তখন ফোনে চার্জে দিয়ে বিস্কুট মুখে দিয়ে আবার উঠানে আসেন বিধান। এ সময় নন্দিনী বিস্কুট চাইলে তাকে বিস্কুট দিতে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান তিনি। এরপর নন্দিনীকে বিস্কুট খাইয়ে গলা টিপে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে রাখেন বিধান।
জবানবন্দিতে বিধান আরও জানান, প্রথমে নিজেদের বাড়ির পাশের পাটক্ষেতে গর্ত করে মরদেহ পুঁতে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। স্থানীয়রা কি করছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ছাগল মারা গেছে, তা পুঁতে রাখছেন। কিন্তু দুর্গন্ধ হবে বলে স্থানীয়রা তাকে বাঁধা দেন।
পরে তিনি নন্দিনীর বাড়ির পেছনের ভুট্টা ক্ষেতে গর্ত করেন এবং বিকেল ৫টার পরেই নন্দিনীর বাড়ির সামনে দিয়ে তারই বস্তাবন্দি মরদেহ নিয়ে ওই গর্তে পুঁতে রাখেন। এতসব কাজ করার সময় বিধানের বাড়িতে কেউ ছিল না। বাবা-মা দুজনে বাড়ির বাইরে থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করেন তিনি।
মামলাটি তদন্ত শেষ করে তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ মো. আইয়ুব তুহিন গত ১৩ আগস্ট আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। এরপর ১৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। ১৭ আগস্ট থেকে ১৯ আগস্ট তিনদিনে এ মামলার ২৩ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত। পরে মাত্র ছয় কার্যদিবসে ২৩ আগস্ট আলোচিত নন্দিনী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এড. হুমায়ুন রেজা স্বপন বলেন, এটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত একটি মামলা ছিল। পুলিশ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবার সহযোগিতায় দ্রুত চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়েছে। চার্জশিট পাওয়ার পর মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে আদালত এই রায় দিয়েছেন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/181077