পাবনার মোবারকপুর হতে চলেছে উত্তরাঞ্চলের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র
শাহীন রহমান, পাবনা: দেশে গ্যাস সংকটের মাঝেই একটি আশার খবর জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড(বাপেক্স)। পাবনার সুজানগর উপজেলায় একটি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটি। সুজানগর উপজেলার মোবারকপুরে প্রায় ৬ একর জায়গা অধিগ্রহণ করে চলছে ভূমি উন্নয়নের কাজ। মূল খনন কাজ শুরু হবে ২০২৮ সালে। পাওয়া যেতে পারে ২০ বছরের গ্যাসের মজুত।
দেশে এখন পর্যন্ত যে সকল গ্যাস কূপ খনন সফল হয়েছে এবং সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, তার বেশিরভাগই চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। তবে এবার দেশের উত্তরাঞ্চলে গ্যাসের সন্ধানে বড় ধরণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। আর এ লক্ষ্যেই পূর্বে খননচেষ্টা ব্যর্থ হলেও উত্তরাঞ্চলে বিশাল গ্যাস মজুতের উচ্চ সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে পাবনার মোবারকপুরে পুনরায় নতুন কূপ খনন প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাপেক্স। অতীতের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সাফল্য নিশ্চিত করতে এবার চীনা একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছে এ প্রতিষ্ঠানটি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি, অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, ২০১৪ সালে ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার খননের লক্ষ্য নিয়ে খনন কাজ করে, নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছানোর পর তীব্র গ্যাস চাপের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ঐ চাপ অতিক্রম করে গভীরে যাওয়ার প্রযুক্তি তখন ছিল না বলেই প্রকল্পটি স্থগিত করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এ লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ হাজার ১৩৬ দশমিক ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি গভীর অনুসন্ধান কূপ (ম্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ এবং ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খননের মেগা প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। এর মধ্যে সরকার ঋণ হিসেবে দেবে ৯০৯ কোটি টাকা এবং বাপেক্স নিজস্ব অর্থায়ন করবে ২২৭ দশমিক ২৫ কোটি টাকা।
মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পের পরিচালক এবং বাপেক্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) এস.এ.এম মেরাজুল আলম বলেন, ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খননের জন্য উন্নত কারিগরি সক্ষমতা প্রয়োজন। এজন্য চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিডিসি) সাথে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সংস্থাটি খনন ও রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণকাজ পরিচালনা করবে। সিসিডিসি বর্তমানে কুমিল্লায় তাদের খনন কাজ চালাচ্ছে এবং সেখান থেকে রিগ ও সরঞ্জাম মোবারকপুরে স্থানান্তর করা হবে।
সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৮ সালের শেষের দিকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এ ক্ষেত্র থেকে ২০ বছর মেয়াদে দৈনিক অন্তত ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে বলে জানান পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
প্রকল্প পরিচালক মেরাজুল আলম নিশ্চিত করেন, ভূমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প এলাকার ভূমির উন্নয়ন ও পাইলিংয়ের কাজ চলছে। ২০২৮ সালের জুন মাসের মাঝামাঝিতে ড্রিলিং শুরু হবে। এ বিষয়ে সুজানগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর রাশেদুজ্জামান রাশেদ জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে আহমেদপুর মৌজার ৬ একর জমি বাপেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বাপেক্সের উপ-সহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম জানান, প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পাইলিংয়ের কাজ গত জুলাই মাসে শুরু হয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। বর্তমানে যেখানে প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে সেটি পূর্বের প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে। তবে কর্মকর্তারা জানান, পুরো অঞ্চলই গ্যাসের প্রাচুর্যতা রয়েছে। এখন সঠিক একটি স্থানে কূপ খনন করে গ্যস উত্তোলন শুরু করতে পারলে আশেপাশে আরও একাধিক কূপ খনন করা যাবে বলে জানান তারা।
উল্লেখ্য, এর আগে পেট্রোবাংলা ১৯৮০-৮১ সালে মোবারকপুরে ভূ-কম্পন জরিপ করে এবং গ্যাসের সম্ভাব্যতার প্রাথমিক ধারণা পায়। পরবর্তীতে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান ১৯৮৩-৮৪ সালে আবারও ভূ-কম্পন জরিপ করে আশানুরুপ ফলাফল পায়। এছাড়া বাপেক্স ২০০৬-০৭ এবং ২০০৭-০৮ সালে আবারও জরিপ করে গ্যাসের সম্ভাব্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরে ২০১৪ সালে খনন প্রকল্প শুরু হয়।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180984