বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বহুবিদ্যাবিশারদ শিল্পী সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়
সত্যিকারের প্রতিভা নিহিত থাকে সৃষ্টি করার, অনুপ্রাণিত করার এবং হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন করার ক্ষমতার মধ্যে-বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪-পরগণার হাবড়ার তারুণ্যদীপ্ত প্রতিভা সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়।
কিছু মানুষ শিল্পকে কেবল পেশা হিসেবে বেছে নেন না; তাঁরা শিল্পকে করে তোলেন নিজেদের অস্তিত্বের ভাষা। তাঁদের কাছে সৃষ্টিই আত্মপ্রকাশ, আর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তাঁরা পৃথিবীর সঙ্গে কথা বলেন। বহুবিদ্যাবিশারদ সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বিরল সৃজনশীল মানুষদের একজন, যাঁর শিল্পযাত্রার বিস্তার সংগীত থেকে কবিতা, গল্প থেকে সাহিত্য, কণ্ঠ থেকে সুর-একটি মাত্র মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একাধারে গায়ক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, মহাকাশবিজ্ঞান গবেষক, নাট্যকার ও বহুবিদ্যাবিশারদ। একই সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিশীল পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর অনুসন্ধিৎসু মন।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে গান গাওয়া এবং কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পজীবনের সূচনা। সেই শৈশবের সৃজনস্পৃহাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক বিস্তৃত শিল্পদর্শনে। গান, কবিতা ও গল্প লেখার পাশাপাশি তিনি সুর সৃষ্টি করতে শুরু করেন, সংগীত পরিচালনার জগতে প্রবেশ করেন এবং নিজের কণ্ঠে বহু সৃষ্টি পরিবেশন করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর শিল্পচর্চা হয়ে উঠেছে আরও বিস্তৃত, আরও পরিণত এবং আরও বহুমাত্রিক।
তাঁর পথচলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো-তিনি কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। একজন গায়ক যেমন অনুভূতিকে কণ্ঠে ধারণ করেন, একজন গীতিকার তেমন অনুভূতিকে শব্দে রূপ দেন; একজন সুরকার সেই শব্দে প্রাণ সঞ্চার করেন এবং একজন সঙ্গীত পরিচালক সমগ্র সৃষ্টিকে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রুতিময় অভিজ্ঞতায় পরিণত করেন। সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রতিটি ভূমিকাকেই নিজের সৃজনশীল যাত্রার অংশ করে নিয়েছেন।
তাঁর সংগীতের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের অনুভূতি। প্রেম, বিরহ, স্বপ্ন, জীবন, সমাজ, প্রতিবাদ, মানবিকতা এবং অস্তিত্বের নানা প্রশ্ন তাঁর সৃষ্টিতে বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর কাছে একটি গান কেবল সুর ও শব্দের সমন্বয় নয়; বরং তা মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম।
এই সৃজনদর্শনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘আলোর স্রোতে ভেসে’। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি গানটির কথা লিখেছেন, সুর সৃষ্টি করেছেন এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। গানটিতে তাঁর সৃজনশীলতার পাশাপাশি প্রকাশ পেয়েছে একজন তরুণ শিল্পীর স্বপ্নকে বৃহত্তর সংগীতজগতের সঙ্গে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা। গানটির কণ্ঠ দিয়েছেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গায়ক শান, যা সৃষ্টিটির প্রতি আরও বিস্তৃত শ্রোতামহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এর আগে মাত্র ২১ বছর বয়সে ‘পাশ কাটিয়ে তোর’ গানটির কথা, সুর এবং সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্বও তিনি নিজেই পালন করেন। গানটি পরিবেশন করেছেন সারেগামাপা-খ্যাত শিল্পী অঙ্কিতা ভট্টাচার্য। একজন অপেক্ষাকৃত তরুণ স্রষ্টার জন্য এমন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতচিন্তার বিস্তৃত পরিসরকেই তুলে ধরে।
‘হয়ে যেতে পারি তোর’ গানটিতেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার একই ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। গানটির কথা, সুর এবং সঙ্গীত পরিচালনা সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর; কণ্ঠ দিয়েছেন বরেণ্য সাহা ও সহেলী চক্রবর্তী। অন্যদিকে ‘অল্প নীলের গল্প’ তাঁর লেখা, সুর করা ও সঙ্গীত পরিচালিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি, যা পরিবেশন করেছেন সারেগামাপা-র প্রথম চ্যাম্পিয়ন সুজয় ভৌমিক।
তবে তাঁর শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায় প্রতিবাদের সংগীতে। আর. জি. কর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসককে ঘিরে আলোচিত নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে তিনি রচনা করেন ‘চেতনা ফেরাতে হবে’। গানটির কথা, সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি নিজের কণ্ঠেই তিনি তা পরিবেশন করেন। এই সৃষ্টি দেখিয়ে দেয়, সংগীত তাঁর কাছে কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে এটি প্রতিবাদ, বিবেক এবং সামাজিক সচেতনতারও শক্তিশালী ভাষা হতে পারে।
তাঁর সুর ও সঙ্গীত পরিচালনায় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত গায়িকা আকৃতি কাক্কার-ও গান গেয়েছেন। পাশাপাশি বাংলা ও হিন্দি ভাষায় তাঁর লেখা, সুর করা ও সঙ্গীত পরিচালিত আরও বহু গান তাঁর নিজের কণ্ঠে এবং বলিউড ও টলিউডের একাধিক পরিচিত শিল্পীর কণ্ঠে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিস্তৃত পরিকল্পনা তাঁর সৃষ্টিশীল উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিধি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।
কিন্তু সংগীতই বহুবিদ্যাবিশারদ সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়’র সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তাঁর আরেকটি শক্তিশালী সৃজনভূমি হলো কবিতা। বাংলা ভাষার পাশাপাশি তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইংরেজি কবিতাও রচনা করেছেন। তাঁর ইংরেজি সাহিত্যকর্মে স্থান পেয়েছে বিশ্বজনীন অনুভূতি, মানবিক চেতনা, প্রেম, অস্তিত্ব, প্রকৃতি এবং মহাবিশ্বকে ঘিরে গভীর কাব্যিক অনুসন্ধান। ভাষা তাঁর কাছে কোনো সীমারেখা নয়; বরং অনুভূতিকে বৃহত্তর পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি সেতু।
তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মহাবিশ্বের প্রতি বিস্ময় এবং মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন। কখনও প্রেম তাঁর কবিতায় হয়ে ওঠে আত্মার ভাষা, কখনও বিরহ হয়ে ওঠে অন্তর্জগতের ভূমিকম্প, আবার কখনও মহাকাশ ও অসীমতার প্রতীক ব্যবহার করে তিনি মানুষের ক্ষুদ্র অথচ গভীর অস্তিত্বকে নতুনভাবে দেখতে চান। সামনেই তাঁর অনেকগুলি কবিতা দুটি খন্ডে প্রকাশ পেতে চলেছে; তাঁর কবিতা সবাই কিনে পড়লেই তাকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে পারবেন।
গল্প লেখার ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ একইভাবে বহুমাত্রিক। তাঁর গল্পে মানবজীবনের আবেগ, সম্পর্ক, বাস্তবতা এবং চিন্তার জটিলতা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। চরিত্র ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে মানুষের অন্তর্লোককে বোঝার চেষ্টা তাঁর গল্পসাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ফলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসর কেবল শ্রুতিমাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পাঠকের কল্পনার জগতেও প্রবেশ করে।
একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় কেবল তাঁর সৃষ্টির সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় তিনি কতটা সততার সঙ্গে নিজের অন্তর্গত পৃথিবীকে সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন তার ওপর। পলিম্যাথ সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পযাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, কৈশোরের শুরু থেকে সৃষ্টির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ক্রমে একটি দীর্ঘ সাধনায় পরিণত হয়েছে। গান থেকে কবিতা, কবিতা থেকে গল্প, শব্দ থেকে সুর, সুর থেকে পরিবেশনা-প্রতিটি ধাপে তিনি নিজের শিল্পীসত্তাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন।
তাঁর এই যাত্রায় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়-সৃষ্টির প্রতি নিরলস আকর্ষণ। জনপ্রিয়তার চেয়ে সৃষ্টির আনন্দ, পরিচয়ের চেয়ে শিল্পের বিস্তার এবং সীমাবদ্ধতার চেয়ে সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা তাঁর কাজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।
আজকের পৃথিবীতে, যেখানে শিল্প ক্রমশ দ্রুত ভোগের সামগ্রীতে পরিণত হচ্ছে, সেখানে এমন শিল্পীর প্রয়োজন যিনি সৃষ্টিকে আবার অনুভব করার, ভাবার এবং প্রশ্ন করার একটি জায়গা করে তুলতে পারেন। সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বহুমুখী শিল্পচর্চা সেই সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়। একজন ১৩ বছরের কিশোরের কণ্ঠে শুরু হওয়া যে যাত্রা আজ গান, কবিতা, গল্প, সুর ও সঙ্গীত পরিচালনার বিস্তৃত জগতে এসে পৌঁছেছে, তার শেষ অধ্যায় এখনও লেখা হয়নি। বরং বলা যায়, তাঁর সৃজনযাত্রা এখনও নির্মাণাধীন-প্রতিটি নতুন গান একটি নতুন দরজা, প্রতিটি কবিতা একটি নতুন আকাশ, প্রতিটি গল্প একটি নতুন পৃথিবী।
শিল্পের ইতিহাসে কিছু যাত্রা সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়, আবার কিছু যাত্রা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। সুস্নাত’র সামনে এখন সেই দ্বিতীয় পথের সম্ভাবনা। সুস্নাত একজন বহুবিদ্যাবিশারদ, বহুজ্ঞ বা সর্বজ্ঞ যার হাতে শব্দ, কণ্ঠে সুর, চিন্তায় কবিতা এবং স্বপ্নে এক বৃহত্তর পৃথিবী। শেষ পর্যন্ত একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর উপাধি নয়-তিনি মানুষের হৃদয়ে কতটা আলো জ্বালাতে পেরেছেন, সেটিই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার। আর পলিম্যাথ সুস্নাত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর শিল্পযাত্রার সবচেয়ে সুন্দর সম্ভাবনাটি হয়তো এখানেই-তিনি এখনও লিখছেন, এখনও সুর সৃষ্টি করছেন, এখনও গান গাইছেন, এখনও স্বপ্ন দেখছেন।
সুস্নাত ব্যানার্জী বলেন, ‘যে মানুষ দর্শন বিষয়টি বোঝেনা সে মানুষ শিক্ষার কোনো বিষয় বোঝেনা তার কারণ হলো দর্শন বিষয়টি হলো প্রত্যেকটি শিক্ষার বিষয়ের বীজ; দর্শনই হলো সমস্ত কিছুর ছায়া; দর্শনই হলো সৃষ্টির আদি কম্পন। কারণ সত্যিকারের সৃষ্টিশীল মানুষের যাত্রার কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নেই। সৃষ্টি চলতে থাকে। স্বপ্ন চলতে থাকে। আর শিল্প-তার নিজস্ব অনন্ত পথে-মানুষের হৃদয় থেকে হৃদয়ে যাত্রা করে।’
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180565