উত্তরাঞ্চলের বাতিঘর: দৈনিক করতোয়ার ৫১ বছর আর আমার একটা গল্প
সামিউর রহমান : বলতে গেলে, দৈনিক করতোয়া শুধু একটা পত্রিকা নয়। উত্তরবঙ্গের মানুষের হৃদস্পন্দন, গণমানুষের মুখপত্র এই কথাগুলো অনেকেই বলেন। কিন্তু যে মানুষটা প্রতিদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে পত্রিকার পাতা ওল্টায়, সে বোঝে করতোয়া মানে কী। ১৯৭৫ সালে যাত্রা শুরু। পাঁচ দশক! ভাবুন তো, কত জল গড়িয়েছে, কত দিন বদলেছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের এই বাতিঘরটা টিকে আছে। ঢাকার বড়বড় জাতীয় দৈনিকের ভিড়ে করতোয়া নিজের একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। কীভাবে? সত্যিকারের সাহস আর নিরপেক্ষতা দিয়ে।
বগুড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে রংপুরের হাটবাজার সবখানেই করতোয়ার গন্ধটা চেনা। কিন্তু আমি আজ এখানে শুধু পত্রিকার ইতিহাস বলতে আসিনি। আমার নিজের একটা গল্প আছে। একটা গল্প, যেখানে দৈনিক করতোয়া ছিল মূল চরিত্র। সাল ২০০৬ বা ২০০৭। ঠিক মনে নেই। তখন আমি তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। ছোট্ট একটা ছেলে। ক্রিকেটের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা। বাসায় বাবা 'প্রথম আলো' আর 'ইত্তেফাক' আনতেন। কিন্তু বগুড়ার ক্রিকেট? স্থানীয় মাঠের খবর? বিসিবির বাছাই পরীক্ষার বিজ্ঞাপন? সেগুলো কোথায় পাওয়া যেত? শুধু এক দৈনিক জায়গায় করতোয়ায়।
একদিন বিকেলে। বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলতে গিয়েছি। হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার করে বলল, “বিসিবির অনূর্ধ্ব-১৩ দলের ট্রায়ালের বিজ্ঞাপন করতোয়ায় এসেছে!” আমার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছুটে গেলাম বাড়িতে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "বাবা, আর কিছু লাগবে না। কিন্তু দৈনিক করতোয়া লাগবেই। প্রতিদিন লাগবে।” বাবা প্রথমে হেসে ছিলেন। ছেলের এই ক্রিকেট পাগলামি দেখে। কিন্তু আমার চোখের আগুন দেখে বুঝলেন এটা শুধু ছেলে মানু-যি কিছু নয়। পরদিন থেকে বাসায় করতোয়া আসতে শুরু করল। আর সেই পত্রিকার পাতায়... ওহ! কী সুন্দর করে সাজানো ছিল সেই বিজ্ঞাপন। তারিখ, সময়, নিয়ম সব করতোয়া কিছু পরিষ্কার। আমি সেই বিজ্ঞাপন পড়ে ২০০৭সালে বগুড়া অনূর্ধ্ব-১৩ দলের বাছাইয়ে গেলাম। নিজের সেরাটা দিলাম। আর চান্স পেয়ে গেলাম! বিসিবির অধীনে এক মাসের আবাসিক ক্যাম্প।
অনূর্ধ্ব-১৩ দলে খেলার সুযোগ। সেই এক মাস... আজও চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই। সকালের অনুশীলন, মাঠের ঘাসের গন্ধ, কোচের গলা। জীবনের সেরা সময়গুলোর একটা ছিল সেটা। আর এখন যখন ভাবি যদি দৈনিক করতোয়া সেই ছোট্ট বিজ্ঞাপনটা না দিত? যদি সেই তথ্যটা আমার কাছে না পৌঁছত? তাহলে? হয়তো আমি সেই
ট্রায়ালেই যেতাম না। আমার ক্রিকেটের স্বপ্নটা অধরাই থেকে যেত। শুধু আমি না। আমার মতো শত শত ছেলে আছে, যাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এই পত্রিকা। একটা সার্কুলার, একটা খবর, একটা তথ্য জীবন বদলে দিতে পারে। দৈনিক করতোয়া সেটা বারবার প্রমাণ করেছে। পত্রিকা মানে কী? শুধু কাগজে কালি? না। পত্রিকা মানে একটা অঞ্চলের কন্ঠস্বর। মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। উত্তরবঙ্গের সমস্যাগুলো জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব করতোয়া কাঁধে তুলে নিয়েছে বারবার।
দৈনিক করতোয়া ৫১ বছরে পা দিয়েছে। ৫১ বছর। কত পত্রিকা এসেছে, গেছে। কিন্তু করতোয়া টিকে আছে। কেন? কারণ এটা শুধু সংবাদ ছাপে না, মানুষের হৃদয়ছোঁয়া। ডিজিটাল যুগে এখন সব কিছু ফোনের স্ক্রিনে। কিন্তু ছাপা কাগজের একটা গন্ধ আছে, একটা আবেগ আছে সেটা করতোয়া এখনো ধরে রেখেছে। উত্তরবঙ্গের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়ে, তরুণদের স্বপ্নের সারথি হয়ে দৈনিক করতোয়া আরো অনেক দিন আলো ছড়াক। আগামীর পথে আরো এগিয়ে যাক এই প্রত্যাশায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ০১৭৯৭-০৪৪৪৮০
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180540