কারিগরি শিক্ষায় আত্মমর্যাদার ভবিষ্যৎ গড়ি
আতাউর রহমান মিটন : গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, দেশের যুবদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ক্রমশঃ বাড়ছে। দেশের শিক্ষার হার যেমন বাড়ছে তেমনি বাড়ছে বেকারত্ব। কারণ চাকরির ক্ষেত্র বাড়ছে না। করোনা, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, দেশের অভ্যন্তরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইত্যাদি কারণে দেশ-বিদেশে চাকরির বাজার সংকুচিত। এভাবে চলতে থাকলে যুব-তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়তে বাড়তে এক সময় বড় সংকটের সৃষ্টি করবে। যা কেবল পরিবারকেই নয়, বরং গোটা জাতিকেই হুমকির মুখে ফেলবে।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস যুব-তারণ্য নির্ভর। অনেকেই মনে করেন, সরকারের উপর বিদ্যমান গভীর ক্ষোভ ও হতাশা যুব-তবশদের রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এটা ঠিক দলীয় ব্যাপার নষ, চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। বিষয়টা মনে রাখা এজন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, যুব তারুণ্যের এই মহাশক্তিকে বুঝতে ও সঠিকভাবে ব্যবহারে ব্যর্থ হলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়।
প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের বিদ্যমান যুব-তারণ্যের কর্মের নিশ্চয়তা দেয়া কী সম্ভব? সরকারি খাতের বিবেচনায় সহজ উত্তর হচ্ছে 'না'। তাহলে উপায় কী? উপায় এক, দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি বা উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দুই, কারিগরি তথা প্রযুক্তি শিক্ষার বিকাশ, এবং তিন, বিদেশে কর্মসংস্থান পেতে সহায়তা প্রদান, ইত্যাদি। সাধারণতঃ সবকারে যারা থাকেন তাবা এ কথাগুলো বলেন কিন্তু নাগরিকরা মনে করেন এসব ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা বা প্রচেষ্টা কম। সরকার তার পুরানো কাঠামোতেই কেবল মলম লাগানোর মত করে উপশমভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা করেন। সে কারণেই আমরা বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোতে মৌলিক কোন পরিবর্তন দেখি না।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে অনেকদিন ধরে কথা হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা বাস্তবতা বিবর্জিত। এই শিক্ষায় কষ্ট করে মাষ্টার্স ডিগ্রী পেয়েও কর্মের নিশ্চয়তা নেই। কথাগুলো পুরানো কিন্তু পরিবর্তনের উদ্যোগ কোথায়? বিগত সরকারের আমলে প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির হিড়িক দেখা গিয়েছিল কিন্তু ফল কী হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। ডিজিটাল ইনকিউবেশন সেন্টারগুলো ফ্রি ল্যান্সিংকে কতখানি সহায়তা করেছে সেটারও মূল্যায়ন হওয়া দরকার। রাষ্ট্রের টাকা ব্যয় করে যদি ফল না পাওয়া যায় তাহলে তো অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পপুলার ঘোষণা দিলেই শুধু হবে না,কর্মসংস্থান সৃষ্টির শিক্ষায় জোর দিতে হবে। শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যেকার যে বৈষম্য সেটা নিয়ে সর্বস্তবে আলোচনা হওয়া দরকার। এমন ব্যবস্থা দরকার যেন বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা তরুণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরি পায়। কর্মের আলোচনায় আমাদের দেশে বিদ্যমান জনপ্রিয় মানসিকতা হচ্ছে 'চাকরি'। কারও প্রাতিষ্ঠানিক 'চাকরি' অর্থাৎ অন্যের গোলামী কবার ব্যবস্থা না হলে পরিবার, সংসার, সমাজ সবাই আঁৎকে ওঠে। অথচ উচিত ছিল আত্মকর্মসংস্থানকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা।
একজন উদ্যোক্তা যে একজন চাকুরে'র চেয়ে বেশি সফল এবং মর্যাদাবান সেটা পরিবার ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এর জন্য রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশে এখন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা বেশি সম্ভাবনাময় এবং সুযোগও বেশি। বিশেষ করে কৃষি, খাদ্য ও স্বাস্থ্যখাতে। কারণ অতি ক্ষুদ্র এই বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি, প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লক্ষ। অথচ বিশ্বের ১৯৫টি স্বাধীন দেশের মধ্যে ১৪০টি দেশে জনসংখ্যা ৩ কোটি বা তার চেয়ে কম। এর মধ্যে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশও বয়েছে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের এই বিশাল জনসংখ্যা এক বিরাট সম্পদ। অবশ্য সরকার কিভাবে এই সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছে তার উপর নির্ভর করে এটা সম্পদ নাকি অভিশাপ?
সবাই জানি, বাংলাদেশের জনসংখ্যার সিংহভাগই তরুণ এবং কর্মক্ষম, যাদের গড় বয়স মাত্র ২৬৩ বছর। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে দেশের ১৭ কোটি জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বাজারের উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলার কার্যকর পরিকল্পনা দরকার। কেবল কৃষিখাতেই আমাদের উৎপাদনশীলতা বর্তমানের চেয়ে আরও ১০ গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে দেশের কৃষি অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন। বেমিট্যান্স বা পোশাক খাতের বাইরে সেবাখাতেও আমাদের যুবশক্তিকে কাজে নিয়োজিত করার বিশাল সুযোগ বিদ্যমান। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি, ডাটা সায়েন্স, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং, পর্যটন সেবা, খাদ্য ব্যবসা, ইত্যাদি বহু বহু খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। কিন্তু সামাজিক মূল্যবোধ সহায়ক না হওয়ায় আমাদের তরুণেরা এসব পেশায় খুব বেশি আগ্রহী হচ্ছে না। সরকারকে এখানে এগিয়ে আসতে হবে যাবে এই মানসিকতার পরিবর্তন হয়। আমাদের জনপ্রিয় নেতাদের উচিত তাদের অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করা যাতে তারা আত্মকর্মসংস্থানকে মর্যাদাশীল ভাবতে শেখে। নিজের ব্যবসা নিজেই কবি, আত্মমর্যাদায় ভবিষ্যৎ গড়ি এমন একটা মানসিকতা তৈরিতে নেতাদের এগিয়ে আসার আহবান জানাই।
মনে রাখা দরকার, বড় বড় শহরমুখী জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে গ্রামগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মেগাসিটিগুলো যে এখন ব্যাপক জনকীর্ণতায় চরমভাবে দূষিত, সেখানে মানসিক চাপ ও অস্থিরতা ঘবে ঘরে যে বিরাট অশান্তি তৈরি করছে এবং যার প্রভাব পড়ছে অপেক্ষাকৃত অবহেলিত নারী ও শিশুদের উপর, সেটা বিবেচনায় রেখে শিক্ষা কাঠামোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সবার আগে জরুরি। প্রশাসনিক বিভাগ প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করার চেষে এখন ঢেড় বেশি দরকার কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ও আত্মকর্মসংস্থান সহায়ক আর্থিক প্রণোদনা। এবার যাঁরা মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো তাদের কাছে অনুরোধ, তোমরা কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দাও। তোমরা এগিয়ে আসলেই বিদ্যমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটবে। 'কারিগরি শিক্ষা কম মেধার শিক্ষার্থীদের জন্য', এটা মোটেও সঠিক নয়। জাপান, তাইওয়ান, চীন, ইত্যাদি দেশের সাফল্য আসলে প্রযুক্তির সাফল্য। মেধাবিরা এগিযে আসলে, তোমরা সফল হলেই হাসবে বাংলাদেশ। তোমরাই হতে পারো কারিগরি সক্ষমতায় অনন্য ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ প্রদর্শক।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক ০১৭১১-৫২৬৯৭৯
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180529