হা-ডু-ডু খেলা

হা-ডু-ডু খেলা

এড. মোঃ মোজাম্মেল হক : যুক্তরাষ্ট্রে, ইন্টারন্যাশনাল রিপাব-লিকান ইনস্টিটিউট সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চ নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা গোটা বিশ্বে বিভিন্ন বিষয়ে জনমত জরিপ করে থাকে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের গণতন্ত্র কেমন চলছে সে বিষয়ে তাঁরা একটি জনমত জরিপ করেছে। প্রথমেই বলে রাখি এই জনমত যাঁদের বিপক্ষে যাবে তাঁরা এটা নাও মানতে পারে, আবার যাঁদের পক্ষে যাবে তাঁরাতো খুশি হতেই পারেন। তবে একথা ঠিক, বিদেশী এই সকল জরিপ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের জরিপ প্রতিষ্ঠানের মত নয়, তাঁরা মাঠে কাজ না করে কাউকে খুশি করার জন্য বা ফালতু মনগড়া কোন রিপোর্ট দেননা।

যাহোক, ওই প্রতিষ্ঠানের ফলাফল অনুযায়ী গণতন্ত্রের প্রশ্নে বাংলাদেশের ৬২% উত্তরদাতা দেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থাকে খুব ভালো বলে মত দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে ৫৭পৃষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনের পর বাংলাদেশ ইতিবাচক পথে এগুচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা পুনর্গঠনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করছে। তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী করা একটি চলমান প্রত্রিয়া, যার জন্যে ধারাবাহিক সংস্কার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গটি কেন এখানে উদাহরণ হিসাবে আনলাম ইতিমধ্যেই পাঠক তা অনুমান করতে পেরেছেন।

২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যে নির্বাচন ছিল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন। অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশ জন্মের পর এটাই ছিলো সবচেয়ে ভালো এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ একটি নির্বাচন। তার একটা কারণও ছিলো, আর তাহলো বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের মতো বড় দল নির্বাচনের প্রায় এক দেড় বছর পূর্ব হতেই ক্ষমতায় ছিলো না, ফলে তাঁরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে নাই, আর তার সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালিন সরকারেরতো সদিচ্ছা ছিলোই। হাতের চুরি যেমন আয়নায় দেখার প্রয়োজন হয় না তেমনি বাংলাদেশের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে কোন যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয় না। বিদেশীরাতো বটেই, বাংলাদেশের কোন লোকই বলতে পারবে না যে, নির্বাচনটি একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। ঐ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, বর্তমানে নারী আসনসহ বিএনপির সংসদে ২৪৭টি আসন রয়েছে। সরকারের বয়স মোটামুটি ছয় মাস, এই ছয় মাসের মধ্যে সরকার আর কিবা অগ্রগতি করতে পারে। 

যুদ্ধ বিধবস্তর মত একটি দেশ রেখে গেছে ফ্যাসিস্ট সরকার, যাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, ব্যাংক খাত ধবংস করে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ধবংস করে দেশকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, চামড়া শিল্পকে প্রতিবেশি দেশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, পাট শিল্পকে ধবংস করা হয়েছে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে একাকার করা হয়েছে, এককথায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক, সেই অবস্থায় এই সরকার ক্ষমতা নিয়েছে। তাঁদের এই কয় মাসে কি অগ্রগতি করার আছে? বিগত সরকার বিভিন্ন সেক্টরে যে জঞ্জাল রেখে গেছে এটা সরাতেই সরকারের অনেক সময় লাগবে। একটি পতিত জমি চাষ করে ফসলের আবাদ করার জন্য যেমন অনেক মেহনত করতে হয় তেমনি একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেও সরকারকে অনেক মেহনত করতে হবে। 

সকালের সূর্য উঠলে যেমন দিন বোঝা যায় তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপ দেখলে আগামী দিনে সরকারের কার্যকলাপ কেমন হবে তা কিছুটা অনুমান করা যায়। এরই মধ্যেই কিছু কিছু দল সরকারকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, তারা লং মার্চ করবে, সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, বড় আন্দোলনের জন্যে কর্মসূচি দিবে, সরকারকে ফ্যাসিস্টের মত ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করবে এমনি সব কথাবার্তা তাঁরা ইতিমধ্যেই বলা শুরু করেছে। আমাদের দেশের সরকার ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতির সরকার, যেখানে সরকার সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকে। এই পদ্ধতিতে সরকার বিরোধী দলকে সম্মান করতে বাধ্য, বিরোধী দলের একটি ছায়া মন্ত্রি পরিষদ থাকে, আর শক্তিশালী বিরোধী দল গণতন্ত্রকে আরও মজবুত করে। সেই কারণে দেশকে গড়ে তোলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব না, বিরোধী দলেরও অনেক ভূমিকা রয়েছে। নগরে আগুন লাগলে শুধু বেশ্যালয় পোড়ে না, মসজিদ মন্দিরও পোড়ে, সুতরাং বিরোধী দলেরও মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্য কোন ফ্যাসিস্ট পিছন দরজা দিয়ে আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। 

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গেলে দেশে স্থিতিশীলতা জরুরি। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির জন্যে সরকার ও বিরোধী দলকে একযোগে কাজ করতে হবে, এর কোন বিকল্প নাই, সুতরাং গণতন্ত্রের বাগানে বিরোধী দলকেও মালির কাজ করতে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ড. ইউনূসের চেয়ে অনেক ভালো দেশ চালাচ্ছেন।

বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন এভাবে দেশ চালালে শুধু এবারেই নয়, আগামীতেও বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। হাডুডু আমাদের জাতীয় খেলা। খেলোয়াড় দিক নিশানা ঠিক করে পয়েন্ট নিয়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে চাইলে প্রতিপক্ষ যেমন তাকে টেনে ধরে তেমনিভাবে বিরোধী দল সরকারি দলকে টেনে ধরতে চাচ্ছে, আর সেই কারণেই কি হাডুডু বাঙালির জাতীয় খেলা হয়েছে?

লেখক: উপদেষ্টা, জেলা বিএনপি, বগুড়া ০১৭১১-১৯৭৭১৯

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180235