বইয়ের খোরাক মেটায় বাংলাবাজার

বইয়ের খোরাক মেটায় বাংলাবাজার

শেখ শাহরিয়ার হোসেন : বইপ্রেমীদের কাছে বাংলাবাজার যেন এক আলাদা জগৎ। সাহিত্যের গল্প-উপন্যাস থেকে কবিতা, প্রবন্ধ, ইতিহাস কিংবা ধর্মীয় বইপড়ার নানা রকম খোরাকের সন্ধানে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন পাঠকরা। পুরান ঢাকার সরু গলি আর সারি সারি বইয়ের দোকান ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাজার শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়; দীর্ঘদিন ধরে এটি হয়ে উঠেছে পাঠক, লেখক ও প্রকাশকদের মিলনস্থল। পুরনো ও নতুন বইয়ের গন্ধে মুখর বাংলাবাজার তাই দেশের বইপড়ার সংস্কৃতির এক জীবন্ত ঠিকানা।

পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বাংলাবাজার দেশের প্রকাশনা ও বই ব্যবসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে বাজারের অবকাঠামো ও ব্যবসার ধরন বদলেছে, বেড়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। তবে বইকে ঘিরে এখানকার প্রাণচাঞ্চল্য এখনো অটুট। সাহিত্য, ধর্মীয় বই, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, শিশুতোষ বইসহ নানা ধরনের বইয়ের সন্ধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠক ও বই ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চাশের দশকে বাংলাবাজারে বই ব্যবসার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সে সময়মূলত পাঠ্যপুস্তকের ব্যবসাই বেশি ছিল। দেশভাগের আগে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রকাশনা ব্যবসার প্রভাবও বাংলাবাজারে ছিল। পুরান ঢাকার অল্প কয়েকজন প্রকাশক কলকাতা থেকে সৃজনশীল বই এনে ব্যবসা করতেন। মল্লিক ব্রাদার্সের মতো প্রতিষ্ঠান তখন বাংলাবাজারে সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসা শুরু করে। দেশভাগের পর ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। নওরোজ কিতাবিস্তান, স্টুডেন্ট লাইব্রেরি, গ্রেট ইস্ট লাইব্রেরি, আল হামারা কিতাব মহল, মালিক  লাইব্রেরি, খোশরোজ কিতাব মহল, হার্ডসন অ্যান্ড কোম্পানি ও পুঁথিপত্রের মতো প্রতিষ্ঠান দেশের প্রকাশনা শিল্পের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সে সময় অনেক প্রকাশক নিজেরাও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

শিশু সাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী, যিনি নওরোজ কিতাবিস্তানের কর্ণধার ছিলেন তাদের অন্যতম। পরবর্তীতে বাংলাবাজারের বই ব্যবসা পাঠ্যপুস্তকের গন্ডি পেরিয়ে সাহিত্য ও সৃজনশীল বইয়ের বড় বাজারে পরিণত হয়। আশির দশক থেকে প্রকাশনা ব্যবসার ব্যাপক প্রসার শুরু হয়। এ সময় আগামী, সময় প্রকাশন, অনন্যা, বিদ্যা প্রকাশ, আফসার্স ব্রাদার্স ও অনুপমসহ বহু প্রতিষ্ঠান বই প্রকাশে যুক্ত হয়। ফলে আশির দশককে বাংলাবাজারের প্রকাশনা ব্যবসার স্বর্ণসময় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে এখানে প্রায় দুই হাজার বইয়ের দোকান ও চার শতাধিক প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাঠক ও বই ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। সহায়ক পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি উপন্যাস, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, জীবনী, ইতিহাস, ধর্মীয় ও শিশুতোষ বইয়ের বড় সংগ্রহ রয়েছে বাজারজুড়ে। প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি বইয়ের লেনদেন হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। 

মুদ্রণ, বাঁধাই, পেস্টিং ও পরিবহনসহ বইশিল্পকে ঘিরে বহু মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশকরা জানান, ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাবাজারের অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল টিনের তৈরি একতলা ঘরে। সময়ের পরিক্রমায় সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন বাংলাবাজারজুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন ও আধুনিক মার্কেট। এর মধ্যে মান্নান মার্কেট অন্যতম। নিচতলা থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বইয়ের দোকান রয়েছে এখানে। বই খুঁজতে আসা পাঠকদের কাছে এসব মার্কেট এখন পরিচিত ঠিকানা।

দীর্ঘ পথচলায় বাংলাবাজারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বইয়ের মার্কেট। মান্নান মার্কেট ছাড়াও ইসলামি টাওয়ার, ৩৮ নম্বর মার্কেট, গিয়াস গার্ডেন মার্কেট, বিশাল বুকস মার্কেট, কম্পিউটার কমপ্লেক্স, রোমি মার্কেট, কওমি মার্কেট ও বই বিচিত্রা মার্কেট বই ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এসব মার্কেটে ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি ও নানা বিষয়ের বই পাওয়া যায়।

একসময় নর্থব্রুক হল রোডকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে প্যারিদাস রোড ও হেমেন্দ্র চন্দ্র দাশ রোড পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বইয়ের বাজার। বিভিন্ন গলিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে বইয়ের স্তূপ, দোকানের সামনে সাজানো নতুন বই কিংবা পুরনো বইয়ের সারি। কোথাও প্রকাশক নতুন বই নিয়ে ব্যস্ত, কোথাও পাঠক পছন্দের বই খুঁজছেন। এই ব্যস্ততাই বাংলাবাজারকে অন্য সব সাধারণ বাজার থেকে আলাদা করেছে।

বাংলাবাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিরও দীর্ঘ ইতিহাস। বাজারসংলগ্ন বিউটি বোর্ডিং একসময় ছিল কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র। সেই আড্ডার জৌলুস আগের মতো না থাকলেও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো লেখক-প্রকাশকদের আনাগোনা রয়েছে। নতুন বই প্রকাশ, পান্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা কিংবা পছন্দের বই সংগ্রহ বিভিন্ন প্রয়োজনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে লেখক ও সাহিত্যপ্রেমীরা বাংলাবাজারে আসেন।

বই কিনতে আসা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সুমনা খাতুন বলেন, আমি প্রায়ই বাংলাবাজারে বই কিনতে আসি। এখানে এক জায়গায় বিভিন্ন প্রকাশনীর বই পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও এত সহজে পাওয়া যায় না। বিশেষ করে বাংলাবাজার মোড়ে শিক্ষার্থীদের জন্য পুরনো বই তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। খুচরা বইয়ের দামও অনেক সময় অন্যান্য জায়গার তুলনায় কম থাকে। পাশাপাশি পুরনো ও দুর্লভ বইয়েরও সন্ধান মেলে এখানে। বইয়ের গন্ধ, দোকানগুলোর পরিবেশ এবং বইপাড়ার আবহ আমাকে সবসময় আকৃষ্ট করে।

বাংলাবাজারের বই নিকেতনের স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে বাংলাবাজারে বইয়ের ব্যবসা করছি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে বই কিনতে আসেন। অনলাইনভিত্তিক বিক্রি বাড়লেও পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক বইয়ের চাহিদা এখনো বেশ ভালো। বাংলাবাজার শুধু একটি বাজার নয়, এটি দেশের প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার সঙ্গে হাজারো মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে। তবে অনলাইন বই বিক্রি ও ই-বুকের প্রসারের কারণে বই ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক পাঠক এখন অনলাইনেই বই অর্ডার করছেন। তবু হাতে বই নিয়ে দেখা, পাতা উল্টে পছন্দের বই বেছে নেওয়া এবং এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে পুরনো বা দুর্লভবই খোঁজার অভিজ্ঞতার জন্য পাঠকদের একটি বড় অংশ এখনো বাংলাবাজারমুখী।

সাহিত্য, ধর্মীয় বই কিংবা পুরনো কোনো বইয়ের খোঁজে যারা বের হন, তাদের কাছে বাংলাবাজারের আবেদন তাই এখনো আলাদা। সময় বদলেছে, বই কেনার মাধ্যম বদলেছে, বদলেছে বাজারের চেহারাও। কিন্তু বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ আর বইকে ঘিরে বাংলাবাজারের ব্যস্ততা এখনো টিকে আছে। বইয়ের গন্ধে, পাঠকের আনাগোনায় আর প্রকাশনার ব্যস্ততায় বাংলাবাজার যেন আজও বেঁচে থাকা এক দীর্ঘ বই-ঐতিহ্যের নাম।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180232