হিমাগার ভাড়ার চাপে লোকসানে রংপুরের আলুচাষিরা
রংপুর প্রতিনিধি : একদিকে সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী দাম, অন্যদিকে কমছে আলুর দর। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর কম থাকায় টানা দ্বিতীয় বছরের মতো লোকসানের মুখে পড়েছেন রংপুরের আলুচাষিরা। এর সঙ্গে কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হিমাগার ভাড়া যুক্ত হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হচ্ছেন লোকসানেই আলু বিক্রি করতে।
কৃষকদের অভিযোগ, দ্রুত হিমাগার ভাড়া কমানো না হলে সংরক্ষিত আলুর বড় একটি অংশ বাজারে ছাড়ার আগেই তাদের লোকসান গুনতে হবে। এ অবস্থায় কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া পুনর্র্নিধারণে ১০ সদস্যের একটি সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি কাজ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে কমিটির সুপারিশ রেজুলেশন আকারে প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য এটি শিগগিরই কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয়। উপজেলার পারুল ইউনিয়নের কৃষক হুমায়ন খান জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ১৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। উৎপাদিত আলুর মধ্যে ২ হাজার বস্তা রংপুরের একটি হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। এ পর্যন্ত মাত্র ১৪ বস্তা বিক্রি করতে পেরেছেন। বাজারে আলুর দাম না থাকায় বাকি আলু হিমাগার থেকে বের করতে পারছেন না। বিক্রি করা আলুর প্রতি কেজির দাম পেয়েছেন মাত্র ১৫ টাকা।
একই অবস্থা পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের তালুক গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়ার। তিনি এবার ৪ হাজার বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন। এর মধ্যে ২ হাজার বস্তা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে হিমাগার গেটে জাতভেদে প্রতি কেজি আলু ১৫ থেকে ১৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ উৎপাদন, হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে তার প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় পড়েছে প্রায় ২৩ টাকা। ফলে প্রতি কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালে জেলার ৪২টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৭০ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের একই সময়ে জেলার ৪০টি হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৪১ হাজার ১০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার বিপরীতে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭৪৮ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। আলুর দরপতন ও হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে কৃষকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ১০ সদস্যের সুপারিশ প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রমিজ আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটিতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষক ও হিমাগার মালিকদের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
ইতোমধ্যে কমিটির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে গত বছরের নির্ধারিত হিমাগার ভাড়া কমানোর যৌক্তিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন বিষয় রেজুলেশনে উল্লেখ করে ভাড়া পুনর্র্নিধারণের সুপারিশ প্রস্তুত করা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক ও রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রমিজ আলম বলেন, কমিটির সদস্যদের নিয়ে হিমাগারের ভাড়া পুনর্র্নিধারণের জন্য সুপারিশ রেজুলেশন আকারে প্রস্তুত করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য এটি কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ ও ২০২৬ মৌসুমে জেলায় প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের পরও বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া ও পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে চলতি মৌসুমেও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন আলুচাষিরা।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/180005