পাঠকনন্দিত করতোয়ার সাফল্য সবার!

পাঠকনন্দিত করতোয়ার সাফল্য সবার!

আতাউর রহমান মিটন : ‘করতোয়া’ কেবল একটি নদীর নাম নয়। এর সাথে জড়িয়ে আছে পুন্ড্র সভ্যতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য। করতোয়া নদীর উর্বর প্লাবন ভূমিতে একদিন গড়ে উঠেছিল উন্নত এক কৃষি সভ্যতা, যার পরম্পরা আজও প্রবাহমান। ঐতিহাসিকদের মতে, মহাভারতের বন পর্বে  বর্ণিত ‘পূণ্যতোয়া’ বা পবিত্র জলের নদীটিই হলো আজকের ক্ষীণকায়া ‘করতোয়া’, যা বহুলাংশে মৃতপ্রায়। উল্লেখ্য, পবিত্রতা বিবেচনায় পৌরাণিক গ্রন্থাবলীতে 'পুণ্যতোয়া' নদীর তীরে তিন রাত যাপনকে অত্যন্ত ‘পুণ্যময়’হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। 

সেই করতোয়া নদীর ঐতিহ্য, সমাজ-সভ্যতা বিকাশে করতোয়ার অবদানকে স্মরণে রেখেই ১৯৭৬ সালের ১২ আগস্ট ‘উত্তরবঙ্গের রাজধানী’ খ্যাত বগুড়া থেকে প্রকাশিত হয় দৈনিক করতোয়া। শুরুতে এটি বগুড়ার আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হলেও গত প্রায় আড়াই দশক থেকে দৈনিক করতোয়া দেশের অন্যতম জাতীয় পত্রিকা হিসেবে বগুড়া ও ঢাকা থেকে একযোগে প্রকাশিত হচ্ছে। রাত ঠিক ১২টায় চ্যানেল আই টেলিভিশনে ‘আজকের সংবাদপত্র’ শিরোনামে জনপ্রিয় যে সংবাদ বিশ্লেষণ অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়, সেখানেও দৈনিক করতোয়া উপস্থাপিত হয়, যা এই পত্রিকার জাতীয় গুরুত্বকে তুলে ধরে। 

দৈনিক করতোয়া’র সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ পুরোনো। পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মোজাম্মেল হক ভাই আমার কাছে একজন বড় ভাইয়ের মত। তিনি নিজে ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন, খেলাঘর নামক জাতীয় শিশু সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন, সম্ভবতঃ এখনও উপদেষ্টা। আমি নিজেও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন বগুড়া জেলা সংসদ এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি, বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী মৌমাছি খেলাঘর আসর এর সভাপতি ছিলাম। সুতরাং পত্রিকার বাইরেও লালু ভাইকে আমরা অন্যরকম এক শ্রদ্ধার স্থানে রেখে পথ হেঁটেছি, যা আজও অব্যাহত আছে। দৈনিক করতোয়া এখন ঈর্ষণীয় এক সফলতার নাম। দৈনিক করতোয়া’র সাফল্যের সিঁড়ি বেয়েই গড়ে উঠেছে আজকের করতোয়া গ্রুপ অব কোম্পানীজ। অসংখ্য মানুষের ভালবাসা, শ্রম ও মেধা করতোয়ার বহমান স্রোতধারাকে অব্যাহত রেখেছে। করতোয়াকে আমি পেয়েছি একটা টিম, একটা পরিবার হিসেবে। আমার সময়ের এই পরিবারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আজ আর বেঁচে নেই। বিশেষ করে শ্রদ্ধেয় দীপঙ্কর দা, যাদু ভাই, তবিবর রহমান স্যার, অটল ভাই, মতি ভাইসহ সকলের প্রতি রইল আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। নাম না জানা আরও যাঁরা বিদায় নিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি, গভীর শ্রদ্ধা জানাই। 

দৈনিক করতোয়া’র কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে ঋণী। করতোয়া সুযোগ দিয়েছিল বলেই আমি প্রায় ছয় শতাধিক উপ-সম্পাদকীয় লিখতে পেরেছি। প্রায় প্রতি বুধবার পাঠকের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছি দেশ, সরকার, সমাজ বিকাশ ইত্যাদি বিষয়ে আমার ক্ষোভ, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা স্বপ্ন আর সম্ভাবনার ভাবনাগুলো। এই লেখাগুলোকে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজনে আমি ৫টি বই প্রকাশ করেছি। দৈনিক করতোয়ায় আমার লেখালেখি জীবনের শুরু হয়েছিল শ্রদ্ধেয় উপদেষ্টা সম্পাদক ওয়াসিকুর রহমান বেচান ভাই এর প্রেরণা ও সহযোগিতায়। একানব্বই-বিরানব্বই সালের দিকে ইংরেজী ম্যাগাজিন থেকে অনুদিত লেখা ছাপানোর মাধ্যমে। এরপর ২০১১ সাল থেকে আবারও বেচান ভাইয়ের প্রেরণাতেই সাপ্তাহিক কলাম লিখেছি। আজও তা অব্যাহত আছে। 

উত্তরাঞ্চলসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য দৈনিক করতোয়া সবসময় সোচ্চার থেকেছে। ব্যবসা করেছে কিন্তু আদর্শ বিকিয়ে দেয়নি। আঞ্চলিক কাগজকে অনেক স্থানীয় চাপ সহ্য করতে হয়। তথাপি দলবাজি’র উর্ধ্বে থেকেছে দৈনিক করতোয়া। এই পরিবারের সদস্যরা নিজেদের সৃজনশীলতা ও প্রচেষ্টা দিয়ে পত্রিকাটিকে সর্বজনগ্রাহ্য একটি কাগজে পরিণত করেছেন। সম্পাদকের সাথে সাথে এই সাফল্যের দাবীদার সকলেই। দৈনিক করতোয়া অফিসে বসে কাজ করেছি প্রায় দুই বছরের মত। সে সময় এই পরিবারের কোন সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতার কোন খাদ আমি দেখিনি। সবাই সবাইকে সহযোগিতা করেছেন একটা টিম হয়ে। বগুড়ায় আরও ৫-৬টি কাগজ তখন প্রকাশিত হতো কিন্তু করতোয়া’র সাফল্য ছিল অনেক উপরে। সেই হিসেবে আমাদের একটা অন্যরকম গর্ব ছিল। নিজেকে করতোয়া’র একজন হিসেবে পরিচয় দিতে ভাল লাগতো। এখনও ‘দৈনিক করতোয়া’ আমার হৃদয়ে অনন্য উচ্চতায় রাখা এক ভালবাসা’র নাম। 
সময়ের পরিক্রমায় দৈনিক করতোয়া আজও উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্যতম একটি প্রভাবশালী সংবাদপত্র। মানুষের আস্থার কণ্ঠস্বর হয়ে দৈনিক করতোয়া দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। জানি, এগিয়ে চলার পথ কখনই মসৃণ হয় না, কিন্তু পথচলা অব্যাহত রাখতে হয়। সেটা মনে রেখেছে বলেই হয়তো করতোয়া সফল হয়েছে। মানুষ যে তাঁর আশা ও কর্মপ্রচেষ্টার সমান বড় সেটা প্রমাণ করেছেন শ্রদ্ধেয় লালু ভাই। আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখি তাঁর স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা আর সেই স্বপ্ন পূরণে যথাযথভাবে টিম পরিচালনার দক্ষতা। আপনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন লালু ভাই! আপনার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ূ কামনা করি। 

হলিউডের শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘স্পাইডার ম্যান’ ছবিতে আঙ্কল বেন আততায়ীর গুলিতে মারা যাবার মুহূর্তে পিটার পার্কার তথা স্পাইডার ম্যান এর উদ্দেশ্যে শেষ উচ্চারণে বলেছিলেন, “অসীম ক্ষমতার সাথে আসে, অসীম দায়িত্ব”। এই যে শীর্ষস্থান ধরে রাখার ক্ষমতা দৈনিক করতোয়া লাভ করেছে, এর সাথে সাথে করতোয়া পরিবারকে তাদের অসীম দায়িত্বের কথাটাও মনে রাখতে হবে। সারাদেশে হলুদ সাংবাদিকতার অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ। বহু স্থানেই মানুষ হলুদ সাংবাদিকদেরকে বিশেষ এক নজরে দেখে। তারা আপস করে, ক্ষমতার কাছাকাছি বা সাথে থাকতে চায়, পদলেহন করে ক্ষমতাসীনদের। মানুষের দুর্বলতা বা অসহায়ত্বকে বাগে পেয়ে মানুষের কাছ থেকে অন্যায় সুবিধা নেয়। এটা অনৈতিক চর্চা। আমি উপদেশ নয়, করতোয়া পরিবারকে এ বিষয়ে সবসময় সতর্ক থাকার অনুরোধ করছি এবং আহ্বান জানাচ্ছি আত্ম বিশ্লেষণের। শীর্ষস্থান পাওয়া কঠিন, ধরে রাখা তারও চেয়ে কঠিন। করতোয়াকে সবসময় কথা বলতে হবে বৈষম্যহীনতা, ন্যায়বিচার ও মানুষে মানুষে সমতার আদর্শকে সমুন্নত রেখে। 

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বগুড়াকে নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে স্বপ্ন দানা বেঁধেছে। বগুড়া   বিশ্ববিদ্যালয় করা, বগুড়া বিভাগ ঘোষণা, বগুড়া বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা, বগুড়ায় টেলিভিশন সেন্টার, করতোয়া নদী পুন:খনন, ইত্যাদি  দাবীতে বগুড়াবাসীর সূচিত নাগরিক আন্দোলন কর্মসূচীতে অতীতে দৈনিক করতোয়া পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে। বর্তমান সরকারের আমলে দাবীগুলোর কয়েকটি বাস্তবায়নের পথে। যুগের বাস্তবতায় আরও নতুন নতুন দাবী সামনে আসছে। জনগণের উত্থাপিত দাবীগুলো নায্যতা ও বাস্তবতার আলোকে বাস্তবায়নের পক্ষে দৈনিক করতোয়া অতীতের ন্যায় ভূমিকা রাখবে এটা আমরা প্রত্যাশা করি। বিশেষ করে বগুড়ার মানুষের মেধা ও সামর্থ্যরে কথা বিবেচনায় রেখে বগুড়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প বিকাশে সরকারের নীতি সহায়তা প্রদানের দাবীগুলোতে দৈনিক করতোয়া গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি। 

বগুড়ার মানুষ কারও দয়া বা দাক্ষিণ্য চায় না। প্রাচীন পুন্ড্র জনপদের রাজধানী ছিল বগুড়ার মহাস্থান গড়। এর অর্থ বগুড়া প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে থেকেই একটি সমৃদ্ধ জনপদ। তাই এই জনপদের ঐতিহ্য ও গৌরব যা এখানকার মানুষের ডিএনএ-তে বিদ্যমান সেই উত্তরাধিকারের জাগরণে, সেই পরম্পরায় সমৃদ্ধ ও বিকশিত বগুড়া যেন বাংলাদেশের মানুষের অনুপ্রেরণা হতে পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজ করতে হবে। সেটা সরকারে থাকলেও করতে হবে অথবা বাইরে থাকলেও। দৈনিক করতোয়া সেটা কতখানি করছে তা পাঠকই বিচার করবে। সুতরাং প্রত্যাশা করি বগুড়াসহ সারাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে দৈনিক করতোয়ার ভূমিকা হবেজনগণের পক্ষে, তাদের স্বপ্ন পূরণের প্রেরণা দেয়া। করতোয়া নদী যেমন সবার কল্যাণে বয়ে চলে নীরবে, তেমনি বহমান প্রিয় করতোয়া। কোন দল বা মতকে নয়, জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের মন্ত্রে উজ্জীবিত দৈনিক করতোয়া পরিবারকে জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই। সকল পাঠককে জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা। 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক 
০১৭১১-৫২৬৯৭৯

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/179715