যেমন হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থা

যেমন হওয়া উচিত শিক্ষাব্যবস্থা

প্রজ্ঞা দাস : শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। এটি একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ এক গভীর অন্তঃসারশূন্য সময় পার করছে। যেখানে গন্তব্য অস্পষ্ট, দিকনির্দেশনা বিবর্ণ, আর লক্ষ্য অনির্দিষ্ট। যেখানে জ্ঞানের গভীরতা নেই, চিন্তার মুক্তি নেই, যুক্তির তীক্ষ্মতা নেই। এ এক নিষ্প্রভ, অন্তঃসারহীন ব্যবস্থা, যা জাতিকে এগিয়ে নেয় না; বরং অদৃশ্য এক শেকলে আবদ্ধ রাখে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সমস্যা হচ্ছে এর উদ্দেশ্যহীনতা। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা চাকরিমুখীতায় পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রতিযোগিতার নামে চিন্তার সৃজনশীলতা ধূলিসাৎ হচ্ছে।

 শিক্ষা যেন আজ মুখস্থ বিদ্যার একটি যান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যেখানে দক্ষতা, চিন্তা, এবং যুক্তি এই তিনটি স্তম্ভ ধ্বংসপ্রাপ্ত। এই ব্যবস্থার প্রভাব অর্থনীতিতে সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে শিল্পখাত দুর্বল, প্রযুক্তি খাত স্থবির, এবং উদ্যোক্তা মনোভাবের চর্চা নিস্ক্রিয়। প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমায়, যার ফলে মেধাপাচার একটি নীরব দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই শিক্ষা ব্যবস্থা আরও গভীর ক্ষত তৈরি করছে। মুক্তচিন্তার চর্চা রুদ্ধ করে রাজনৈতিক প্রভাবশালী শক্তিগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের মতবাদ প্রতিষ্ঠার মঞ্চে পরিণত করেছে। চিন্তা এখানে স্বাধীন নয়, বরং দলীয় আনুগত্যে বন্দি। আর এই সংকীর্ণ রাজনৈতিক ভাবনা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা, মতাদর্শিক সংঘাত এবং সৃজনশীলতার অভাব তৈরি করছে। 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগান্তকারী করতে হলে প্রথমেই এর কেন্দ্রীভূত ধারণা ভাঙতে হবে। এটি একটি সার্বিক রূপান্তর, যেখানে শিক্ষা হবে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। শুধু পঠন-পাঠনের কাঠামো নয় বরং এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজনীতি, ও সমাজকে ঢেলে সাজানোর অস্ত্র হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাধারা গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রী ভাববে, বিশ্লেষণ করবে এবং প্রচলিত ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করার দুঃসাহস দেখাবে। এই সাহস ছাড়া জাতি কখনো অগ্রসর হতে পারে না। শিক্ষা হবে সেই শক্তি, যা শিক্ষার্থীকে শেখাবে কেবল উত্তর নয়, প্রশ্ন করতেও। কারণ, প্রশ্নহীন শিক্ষা মৃত চিন্তার জন্ম দেয়। তাই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের পাশাপাশি কিছু যুগান্তকারী ও অভিনব পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যা শিক্ষার মান ও প্রাসঙ্গিকতা বৃদ্ধি করবে এবং শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করবে।

পাঠ্যক্রমের সংস্কার করে যুগোপযোগী ও ব্যবহারিক জ্ঞাননির্ভর করতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত এবং মানবিক শাখার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে। এছাড়া, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশের উপর জোর দিতে হবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের অভাব প্রকট। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণার মনোভাব গড়ে তুলতে স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই গবেষণামূলক প্রকল্প, বিজ্ঞান মেলা, উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতি চালু করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষায় শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথভাবে কারিকুলাম ডিজাইন, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে শিক্ষার্থীরা শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। 

শিক্ষায় বহুভাষিকতা ও বৈশ্বিক দক্ষতা তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরকে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), মেশিন লার্নিং এবং ডেটা সায়েন্সের মতো প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং এ ধরনের প্রযুক্তি শেখা ও ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে হবে। ডিজিটাল শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, অনলাইন কন্টেন্ট এবং ভার্চুয়াল লার্নিং সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ডিভাইসের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবন দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা, কাউন্সেলিং এবং জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং দলগত কাজের দক্ষতা সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন চিন্তা, বাকস্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার্থীদের সামাজিক উদ্যোগ ও স্বেচ্ছাসেবা সম্পর্কে শিক্ষাদান করাতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিউনিটি সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং সামাজিক উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা দক্ষতা গড়ে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম চালু করতে হবে। এতে তারা ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে এবং নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে। 

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সাথে সমন্বয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। এতে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।  শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তর মানে শুধু নতুন পাঠ্যবই ছাপানো নয়, এটি একটি জাতির মানসিক গঠনের পুনর্বিন্যাস। শিক্ষা বিপ্লব ছাড়া অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষার ভিত্তি শক্ত না হলে, জাতির ভিত্তিও দুর্বল হবে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নয়নের শিখরে পৌঁছাতে চায়, তবে শিক্ষার্থীদের এই মুখস্থ বিদ্যার কারাগার থেকে মুক্তি দিতে হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে সৃজনশীল, স্বাধীন, প্রযুক্তি নির্ভর এবং দক্ষতাভিত্তিক। এটি হবে একটি অস্ত্র, যা জাতিকে পুনর্জাগরণের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশকে একটি জ্ঞান ভিত্তিক, আলোকিত ও উন্নত দেশে রূপান্তরিত করতে আমাদের সকলকে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে কাজ করতে হবে। তবেই বাংলাদেশ আগামী দিনের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের মঞ্চে নেতৃত্ব দেবে। 

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ ।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/179712