প্রকৃতি রক্ষা নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই
আব্দুল্লাহ খান : মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে পাহাড় কেটে পথ করেছে, বন উজাড় করে সভ্যতা গড়ে তুলেছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বন্দি করে উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এসবের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে প্রকৃতির উপর বিজয়ী মনে করেছে। কিন্তু আজ কি হচ্ছে? এরপরে একটা দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশ রক্ষা বা জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনাকে একটি কাল্পনিক বা দূরবর্তী সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মনে করা হয়েছে, এটি কেবল মেরু অঞ্চলের বরফ গলা, অ্যামাজনের জঙ্গল কিংবা কোনো বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীকে বাঁচানোর লড়াই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরিবেশ বিনাশের যে বিষবৃক্ষ মানুষ রোপণ করেছে, তার বিষময় ফল আজ অন্য কাউকে নয়, মানুষকেই গ্রহণ করতে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে প্রকৃতিকে ধবংস করা যায় না। অর্থাৎ, আমরা পৃথিবীকে ধবংস করছি না; অসীম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রকৃতি রূপ বদলে ঠিকই বেঁচে থাকবে। ধবংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি কেবল নিজেদের অস্তিত্বকে।
আজকের এই ভয়াবহ বাস্তবতা বুঝতে খুব বেশি গবেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন সকালে আমরা যে বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসে গ্রহণ করি, তা মূলত দূষিত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণিকায় ভরা এক ধীরগতির বিষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাতাসে থাকা এসব অদৃশ্য মারাত্মক উপাদান মানুষের ফুসফুস ও রক্ত সংবহনতন্ত্রে প্রবেশ করে হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং ক্যান্সারের মতো ঘাতক ব্যাধি তৈরি করছে। খাবারের টেবিলে যে অনু আমরা মুখে তুলছি, তা-ও রাসায়নিক ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ভারে জর্জরিত। সুপেয় পানি, যা জীবনের অপর নাম, তা এখন কারখানার বর্জ্য, ভারী ধাতু ও প্লাস্টিক বর্জ্যে দূষিত। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দূষিত পানি ব্যবহারে আমরা বাধ্য হচ্ছি। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এটা এক প্রকার ধীরগতির বিষ। বিশাল বিশাল প্লাস্টিক বর্জ্য যখন রোদের আলো, পানি ও বাতাসের সংস্পর্শে ভেঙে ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ক্ষুদ্র কণিকায় পরিণত হয়, তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে। আধুনিক জীবনের সহজলভ্য পণ্যগুলোই আজ আমাদের শরীরে এই অদৃশ্য বিষ ঢালছে। বাজারের প্লাস্টিকের বোতলে থাকা পানি, চায়ের ব্যাগে থাকা সিন্থেটিক উপাদান কিংবা প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো গরম খাবারের প্যাকেট এসব ব্যবহার করার সময় মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোটি কোটি কণা সরাসরি মিশে যাচ্ছে খাদ্য ও পানীয়তে।
সম্প্রতি গবেষণায় পিঠটান দেওয়ার মতো এক সত্য উঠে এসেছে। মানুষের ফুসফুস, যকৃৎ, এমনকি ধমনীর রক্তেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাতৃদুগ্ধ এবং গর্ভস্থ শিশুর সুরক্ষা বলয় 'প্লাসেন্টা' বা অমরাতেও গবেষকরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা খুঁজে পেয়েছেন। অর্থাৎ, জন্ম নেওয়ার আগেই একটি নতুন প্রাণ তার মায়ের শরীরে বসে প্লাস্টিক সেবন করছে। আজ আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব দেখছি। কোথাও অস্বাভাবিক বন্যা, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও দাবদাহে পুড়ে যাচ্ছে জনজীবন। অন্যদিকে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, হিমবাহ গলে যাচ্ছে, ফলে প্রতিনিয়ত জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। একটা কথা আমরা প্রায়ই বলে থাকি যে, প্রকৃতি আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতি কি সত্যিই প্রতিশোধপরায়ণ? প্রকৃতির তো কোনো ক্রোধ নেই, কোনো প্রতিহিংসাও নেই। প্রকৃতি শুধু তার নিজস্ব নিয়মে চলে। আমরা যখন সেই নিয়মের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি, তখন তার ফলাফল আমাদেরই ভোগ করতে হয়। যার দরুন আমাদের বাসস্থান, স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতি সবই আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। আমাদের প্রজন্মের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটানো।
সুতরাং, পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি আর কোনো বিলাসিতা বা নিছক প্রকৃতিপ্রেমীদের দাবি নয়। পরিবেশ রক্ষা করার মূল অর্থ হলো মানুষকে রক্ষা করা, নিজেদের পরবর্তী ধারাকে টিকিয়ে রাখা। বাতাস, পানি কিংবা মাটিকে ধবংস করে আমরা অন্য কোনো গ্রহ থেকে জীবন কিনে আনতে পারব না। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি যদি অবিলম্বে আমাদের নীতি ও আচরণে বাস্তবায়িত না হয়, তবে পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ এমন এক প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হবে, যারা নিজের হাতেই নিজের বিলুপ্তি ডেকে এনেছিল।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় gotoabdullahkhan2005@gmail.com ০১৩২০-৫৫২২৫০