‘ককরোচ’ বিক্ষোভের পর এবার ভারতের ঝাড়খণ্ডে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে নতুন আন্দোলন

‘ককরোচ’ বিক্ষোভের পর এবার ভারতের ঝাড়খণ্ডে চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে নতুন আন্দোলন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :  প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দিল্লির রাজপথে হওয়া অন্দোলনের কয়েক সপ্তাহ পর, এবার ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে চাকরিপ্রার্থীদের আরেক দল আন্দেলনে নেমেছেন।

রাজ্যের পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে গত ২৫ জুলাই থেকে বিক্ষোভকারীরা রাঁচির এক স্টেডিয়ামে জড়ো হন। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন অনশন শুরু করেছেন।

২৭ বছর বয়সী উম্মে হাবিবা তাদেরই একজন। বোকারোর এক কৃষক পরিবারের সন্তান হাবিবা, ঝাড়খণ্ডের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি আশায় ছিলেন, একটি সরকারি চাকরি পাবেন। ইতোমধ্যেই তিনবার পরীক্ষায় বসেছেন এবং এবার ভালো নম্বর পাবেন বলেও আশা ছিল তার।

হাবিবা বলেন, "আমরা ন্যায়বিচার চাই। জীবন চলে গেলেও আমরা ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।"

তাদের এ ক্ষোভের কারণ এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সিভিল সার্ভিস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা।
জুলাই মাসে ফলাফল ঘোষণার পর চাকরিপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া উত্তরপত্রে দেখা গেছে কিছু উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম প্রশ্নের উত্তর দিয়েও পাশ করেছেন।

এটি ফলাফল জালিয়াতি বা কারচুপির সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আন্দোলনকারীরা পরীক্ষাটি বাতিল করে নতুন করে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। 
এর পাশাপাশি তারা ভারতের প্রধান কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-কে দিয়ে ঘটনা তদন্তের দাবি তুলেছেন।

অভিযোগগুলো ঝাড়খণ্ডের সিআইডি তদন্ত করছে এবং ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা স্থগিত করেছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশন চেয়ারম্যান এল খিয়াংতে ২২ জুলাই পদত্যাগ করেছেন । তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

পরীক্ষা প্রক্রিয়ার কিছু অংশ পরিচালনা করেছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল তা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীরা প্রশ্ন তোলার পর তদন্তকারীরা ওই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও খতিয়ে দেখছেন।

ঝাড়খণ্ড সরকারের মন্ত্রী দীপিকা পান্ডে সিং বিবিসি-কে জানান, প্রতিবাদ শুরু হওয়ার আগেই রাজ্য সরকার অভিযোগগুলোর তদন্ত শুরু করেছিল।

তিনি আন্দোলনকারীদের মামলাটি সিবিআই-এর হাতে না তুলে দিয়ে সিআইডি-কে তাদের তদন্ত শেষ করতে দেওয়ার অনুরোধ জানান। 

তিনি বলেন, "আমরা একটি নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। এর জন্য দায়ী ব্যক্তি কোনো আমলা, কর্মচারী, দালাল বা কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা যে-ই হোক তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।" 

তিনি আরও জানান, গত এপ্রিলের পরীক্ষা বাতিল করার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের যে দাবি রয়েছে, তা নিয়ে সরকার তাদের সাথে সরাসরি আলোচনা করবে।

তবে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাদের এই লড়াই কেবল একটি পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা নিয়োগের অনিয়ম নিয়ে বিস্তর তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার দাবি জানান।

তারা নিয়মিত ও স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা চান, যাতে চাকরিপ্রার্থীদের আর অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।

ভারতে এই চাকরি লড়াইয়ের গুরুত্ব বেশি, কারণ একটি সরকারি চাকরি মানেই একটি নিশ্চিত বেতন, সামাজিক মর্যাদা এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার পথ।

তাই প্রতিযোগিতা এখানে বেশি। অনেকেই মাত্র একটি চাকরির আশায় বছরের পর বছর পার করে দেন।

ঝাড়খণ্ডের বিক্ষোভকারীদের মতে, এই অনিশ্চয়তা তাদের অপেক্ষার প্রহরকে কেবল দীর্ঘায়িত করছে। যেখানে তাদের বন্ধুরা জীবনে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে অনেকেই এখনো বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আছেন।

প্রতিটি বিলম্বিত পরীক্ষা, স্থবির হয়ে থাকা নিয়োগ এবং নতুন নতুন বিতর্কের কারণে যে ভবিষ্যতের জন্য তারা দিনরাত কষ্ট করেছেন, তা যেন আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

চাকরিপ্রার্থী সবিতা কুমারীর এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। ২৮ বছর বয়সী সবিতা এ পর্যন্ত দু'বার রাজ্যের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। চলতি বছরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাস করবেন বলে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী ছিলেন, তাই গভীর রাত পর্যন্ত ফলাফলের অপেক্ষায় জেগে ছিলেন। মাঝরাতের দিকে যখন ফলাফল প্রকাশ হলো, দেখা গেল তালিকার কোথাও তার নাম নেই। 

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সবিতা বলেন, "আমরা সারা রাত কেঁদেছিলাম।"

সবিতার ধারণা, পরীক্ষায় কারচুপি করা হয়েছিল। তার অভিযোগ, কিছু প্রার্থী উত্তরপত্রের ঘর ফাঁকা রেখে এসেছিলেন যেন পরে সেগুলো পূরণ করে দেওয়া যায়। এরপর থেকে সিআইডি উত্তীর্ণ প্রার্থীদের উত্তরপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে এবং ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কার্যালয়সহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়েছে।

কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি) ইতোমধ্যেই ঝাড়খণ্ডের এই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিয়েছে।

আন্দোলন শুরু হয়েছে প্রায় দুই সপ্তহ আগে। আন্দোলনের সমর্থকরা খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন, যার কিছু সরবরাহ করা হচ্ছে সিজিপি-র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

দিনের বেলা অনশনকারীরা ত্রিপলের নিচে তোশকের ওপর শুয়ে থাকেন, আর তাদের পেছনে শোভা পায় বি আর আম্বেদকর ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতিকৃতি। এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও তারা অবস্থান করছেন।

সন্ধ্যার দিকে পরিবেশ বদলে যায়। ভিড় বাড়ে, ভাষণ শুরু হয় এবং স্টেডিয়ামজুড়ে স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। কয়েক ঘণ্টার জন্য পুরো আন্দোলনস্থল আবার নতুন করে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

রাঁচির এই আন্দোলনটি শুরু থেকেই ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে।
আন্দোলনকারীদের সমর্থন জানিয়েছে ঝাড়খণ্ডের বিরোধী দল বিজেপি। দলটি বিক্ষোভ করেছে, রাজ্য বিধানসভায় বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং কেন্দ্রীয় তদন্তের (সিবিআই) দাবিও জানিয়েছে। 

আবার কেন্দ্রীয়ভাবে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্য সরকারের শরিক দল কংগ্রেসও শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন দিয়েছে।

এ আন্দোলনের প্রধান পরিচিত মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো নিজেও অনশনে বসেছেন। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্তন এই প্রার্থী জানান, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেই তিনি নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ২০২৩ সালে নিজে অংশ না নেওয়া সত্ত্বেও অন্য একটি রাজ্যভিত্তিক পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে আয়োজিত আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

অনেক আন্দোলনকারীই কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নিজেদের যুক্ত করতে সতর্ক এবং তারা জোর দিয়ে বলছেন যে, এটি তাদের নিজেদেরই আন্দোলন।

সরকার আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং আন্দোলনকারীরা একটি ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল গঠন করেছেন। তবে শুক্রবার পর্যন্ত দু'পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি।

 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/179218