মহানবীর (সা.) শেষ বিদায়ের ক্ষণ
বিদায় হজ। লক্ষাধিক সাহাবির লাব্বাইক ধ্বনিতে কাবাপ্রাঙ্গন মুখরিত হয়ে উঠল। কী বেহেশতি দৃশ্য আজ! মূর্তি নাই, পুরোহিত নাই; আছে কেবল সর্বশক্তিমান নিরাকার এক আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং সেই আল্লাহ-রাসুলের বান্দা ও উম্মত। এত দিন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং তাঁর ধর্ম যেখানে নির্বাসিত হয়েছিল, আজ সেখানেই উচ্চকিত আল্লাহর নাম। গুঞ্জরিত তাঁর গুণগান। যত দূর চোখ যায়, দিগন্ত জুড়ে কেবল একত্ববাদী মুসলমান, আদিগন্ত উড়ছে ইসলামের বিজয়-নিশান।
প্রাথমিক কার্যাদি সম্পন্ন করে নবীজি চললেন আরাফার দিকে। তারপর মিনা উপত্যকায় উপস্থিত হয়ে সাহাবিদের উদ্দেশে রাখলেন সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য। ইতিহাস যাকে বিদায় হজের ভাষণ বলে স্মরণে রেখেছে আজও এবং স্মরণে রাখবে দুনিয়ার শেষ দিনটির পরও! রাসুল সেদিন তাঁর ভাষণে বলেন:
“আজ যে কথা আপনাদের বলব, তা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আমার আশঙ্কা হয়, আপনাদের সাথে একত্রে হজ করবার সুযোগ বুঝিবা আর আমার হবে না। হে মুসলমানরা, আঁধার যুগের সমস্ত ধ্যান-ধারণাকে ভুলে যান। নব আলোকে পথ চলতে শিখুন। আজ থেকে বাতিল হয়ে গেল অতীতের সকল মিথ্যা সংস্কার, পাপ প্রথা এবং যাবতীয় অনাচার।
মনে রাখুন, সকল মুসলমান ভাই-ভাই। কেউ কারুর থেকে ছোট নন, কারুর থেকে বড়ও নন। আল্লাহর চোখে সবাই-ই সমান। নারী জাতির কথা ভুলবেন না। নারীর ওপর পুরুষের যেরূপ অধিকার আছে, আছে পুরুষের ওপর নারীরও সেইরূপ অধিকার। তাঁদের প্রতি অবিচার করবেন না। মনে রাখুন, আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আপনারা আপনাদের স্ত্রীদের গ্রহণ করেছেন।
সাবধান, ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি করবেন না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংস হয়েছে।
প্রত্যেক মুসলমানের জান-মাল-ইজ্জত-আব্রু পবিত্র বলে জানবেন। যেমন পবিত্র আজকের এই দিন; ঠিক তেমনি পবিত্র আপনাদের পরস্পরের জীবন ও ধন-সম্পদ। হে মুসলমানগণ, হুঁশিয়ার, নেতার আদেশ কখনো লঙ্ঘন করবেন না। যদি কোনো বংশ-পরিচয়হীন কুশ্রী ক্রীতদাসকেও আপনাদের আমির করে দেওয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব অনুসারে আপনাদের চালিত করে, তবে অবনত মস্তকে তার আদেশ মেনে চলবেন। দাস-দাসীর সাথে সদাচার করবেন। তাঁদের ওপর কোনো প্রকার অত্যাচার করবেন না। আপনারা যা খাবেন, তাঁদের তা-ই খাওয়াবেন। তাঁদের তা-ই পরাবেন, যা আপনারা পরিধান করবেন। ভুলে যাবেন না যে তাঁরাও আপনাদের মতোই মানুষ।
সাবধান, পৌত্তলিকতার পাপ যেন পুনর্বার আপনাদের স্পর্শ না করে। শিরক করবেন না। চুরি করবেন না। মিথ্যা বলবেন না। দূরে থাকুন ব্যভিচার থেকে। সর্বপ্রকার মলিনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে পবিত্রভাবে জীবনযাপন করুন। সত্যের সঙ্গ কখনো পরিত্যাগ করবেন না।
হে আমার উম্মত, আমি যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি আপনারা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাকেন, তবে কিছুতেই আপনাদের পতন হবে না। আর যে মহা সম্পদ আমি আপনাদের জন্য রেখে যাচ্ছি, তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসুলের ফরমান।
জেনে রাখুন, আমার পর আর কোনো নবী আসবেন না। আমিই শেষ নবী। যারা উপস্থিত আছেন, তারা অনুপস্থিত সব মুসলমানের কাছে আমার এই বাণীসমুদয় পৌঁছে দিয়েন।’
রাসুলের প্রোজ্জ্বল মুখমণ্ডল ক্রমেই আরও জ্যোতিদীপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। আলোয় ভেসে যেতে থাকলো রাসুলের চোখযুগল। কণ্ঠস্বর হয়ে এল যেন আরও করুণ ও ভাব-গাম্ভীর্যময়। ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে মুখ তুলে তিনি আবেগভরে বলতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, হে আমার প্রভু, আমি আপনার বাণী পৌঁছে দিতে পেরেছি কি? আমি কি আমার কর্তব্য সম্পাদন করতে পারলাম!’
লক্ষ কণ্ঠ নিনাদিত হলো, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!’
তখন নবীজি কাতর কণ্ঠে পুনরায় বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ, আপনি শুনে রাখুন; সাক্ষী থাকুন, প্রভু হে, এ জমায়েত বলছে, আমার কর্তব্য আমি পালন করতে পেরেছি!’ আবেগের আতিশয্যে নবীজি নীরব হয়ে পড়লেন। বেহেশতের জ্যোতির্ময় দ্যুতিতে ভাস্বর হয়ে উঠল তাঁর মুখ-চোখ—সমস্ত অবয়ব!
দুই. একাদশ হিজরির প্রথম মাস। নবীজির (সা.) বয়স তখন ৬৩। মিনা প্রান্তরে শেষ আয়াত যেদিন নাজিল হলো, সে দিনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর কর্তব্য ফুরিয়ে আসছে। শীঘ্রই তাঁকে আল-বিদা জানাতে হবে দুনিয়ার জীবনকে। অবশ্য তারও আগে সুরা নাসরের আয়াত-ক’টি নাজিল হলো যেদিন, সেদিনই তিনি বুঝে নেন, তাঁর ইহলোকের সফর ফুরিয়ে এল বুঝি! এরপর বিদায় হজের প্রাক্কালে অসংখ্য গোত্রকে দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হতে দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আল্লাহর সেই সাহায্য ও বিজয় সত্য-সত্যই চলে এসেছে। কাজেই তাঁর বিদায়সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এসেছে। তা ছাড়া রাসুলের যেই কাজ—দ্বীনের বার্তা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া, প্রাণে প্রাণে তাওহিদের সমীরণ বইয়ে দেওয়া—তা স্পর্শ করেছে চূড়ার শীর্ষ। দ্বীনের দাওয়াত রূপ নিয়েছে পূর্ণতায়। নবীজির (সা.) কথা-কাজে তাই ক্ষণে ক্ষণে বিদায়ী করুণ সুর বেজে উঠছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, এখন তিনি প্রস্তুত তাঁর বন্ধুর সাথে মিলিত হবার জন্য।
একাদশ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ, সোমবার, চাশতের সময় হবে তখন। বেশ কিছুদিনের অসুস্থতার পর মহানবী (সা.) তখন মৃত্যুশয্যায়। থেকে থেকে বদলে যাচ্ছিল তাঁর পবিত্র অবয়ব। কখনো হয়ে যাচ্ছিল লাল, কখনো ফ্যাকাশে, কখনো বা বিবর্ণ। মহানবীর (সা.) মুখে তখন ধীরে ধীরে উচ্চারিত হচ্ছিল, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। মৃত্যু সত্যিই বড় কষ্টের!’ এক পর্যায়ে তিনি মিসওয়াক করলেন। চেহারার উজ্জ্বলতা বেশ বেড়ে গেল। সাথে সাথেই দুই হাত ওপরের দিকে উঠালেন। মনে হলো, কোথাও রওয়ানা হচ্ছেন। মুখে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল, ‘এখন আর কিছুই নয়, শুধু শ্রেষ্ঠ বন্ধু আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য চাই।’ এভাবে তিনবার বলার সাথে-সাথেই হাত নিচে পড়ে গেল। চোখের পুতলি উপরের দিকে উঠে গেল এবং পবিত্র রুহ চিরতরে দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিল!
শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে। এ সংবাদ শুনে সবার কলিজা যেন ছিঁড়ে গেল। পা ভেঙে পড়ল। হাত অবশ হয়ে এল। চোখ ঝরাতে শুরু করল রক্তাশ্রু। সূর্যের আলোও যেন অন্ধকার হয়ে পড়ল। কেউ ঠিক থাকতে পারছিল না। যারা বসে ছিলেন, তারা উঠতে পারছিলেন না। যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন, তারাও ভুলে গেলেন বসার কথা। সবার ওপরে যেন ভেঙে পড়ল শোকের পাহাড়!
আবু বকর (রা.) ঢুকলেন আয়েশার (রা.) ঘরে। নবীজির (সা.) শরীর মোবারক তখন ইয়েমেনি চাদর দিয়ে আবৃত। মুখ থেকে চাদর সরিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে চুমো খেলেন। বললেন, ‘আমার বাবা-মা আপনার ওপর কোরবান হোক। আপনার জীবন ছিল পবিত্র, আপনার মৃত্যুও পবিত্র। আল্লাহর কসম, এরপর আপনার আর দ্বিতীয়বার মৃত্যু হবে না। যে মৃত্যু আপনার ভাগ্যে লেখা ছিল, তা এসে গেছে।’ এ কথা বলে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। দেখলেন, মসজিদে নববিতে ওমর (রা.) ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘মুনাফিকরা বলে, নবীজি (সা.) নাকি ইনতেকাল করেছেন। আল্লাহর শপথ, তাঁর মৃত্যু হয়নি। তিনি মুসার (আ.) মতো আল্লাহর সান্নিধ্যে আহুত হয়েছেন। তিনি অচিরেই ফিরে আসবেন। যারা তাঁর মৃত্যুর অপবাদ দিচ্ছে, ফিরে এসে তিনি তাদের হাত-পা কেটে অপবাদের শাস্তি দেবেন।’
আবু বকর বললেন, ‘ওমর, শান্ত হও, চুপ করো!’ কিন্তু এতে কোনো কাজ হলো না। ওমর বলেই চলছেন এসব! তখন তিনি একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে সমবেত সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আপনাদের মধ্যে যারা মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইবাদত করতেন, তারা জেনে রাখুক, তিনি ইনতেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেন, তারা জেনে নিন যে, তিনি চিরঞ্জীব। তাঁর কখনো মৃত্যু হবে না।’
এরপর আবু বকর (রা,) পড়লেন সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ নং আয়াত:
“মুহাম্মাদ একজন রাসুল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রাসুল গত হয়ে গেছেন। তিনি যদি মারা যান অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না; আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সাওয়াব দান করবেন।”
কোরআনের এই আয়াত শুনে মুসলমানদের ঘোর কাটে। আর ঘোর কাটতেই চমকে ওঠে তারা প্রত্যেকে। ওমর মাটিতে বসে পড়েন। সবার বিশ্বাস হয়, নবীজি (সা.) সত্যিই ইনতেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
সূত্র: সিরাতে রাসুল: শিক্ষা ও তাৎপর্য পৃ: ১৩৮,১৩৯
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/179100