মাতৃত্ব নিয়েই কেন শর্ত, পিতৃত্ব কেন নয়?
লাইফস্টাইল ডেস্ক : সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব কি শুধু মায়ের? নাকি মা-বাবা দুজনেরই সমান? ভারতে উত্তর প্রদেশের গভর্নর আনন্দীবেন প্যাটেলের একটি মন্তব্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে এই প্রশ্ন। তিনি নারীদের আইএএস কর্মকর্তা বা শিক্ষক হওয়ার আগে ‘বিশেষজ্ঞ মা’ (Expert Mother) হওয়ার পরামর্শ দেন।
ইন্ডিয়া টুডের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এটি শুধু ভারতের বিতর্ক নয়, বরং বিশ্বের অনেক সমাজেই নারী-পুরুষের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সমাজ এখনো অনেকাংশে ধরে নেয়, পুরুষের প্রধান দায়িত্ব উপার্জন করা আর সন্তানের দেখভাল ও পরিবারের যত্ন নেওয়া নারীর কাজ। ফলে কর্মজীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি সন্তান লালন-পালন, ঘরের কাজ এবং পরিবারের মানসিক দায়িত্বও অনেক সময় নারীকেই বেশি বহন করতে হয়।
অথচ একই ধরনের প্রত্যাশা পুরুষদের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মৈত্রেয়ী সেনের মতে, সমাজে ‘বিশেষজ্ঞ বাবা’ বলে তেমন কোনো ধারণাই নেই। কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পুরুষদের বলা হয় না যে, আগে আদর্শ বাবা হতে হবে, তারপর বড় চাকরি বা প্রশাসনিক ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেখতে হবে। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এমন পরামর্শ প্রায়ই দেওয়া হয়।
মনোবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক সিমান্তিনী ঘোষ বলেন, এই ধরনের সামাজিক প্রত্যাশা শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও ক্ষতি করে। পুরুষদের ওপর সব সময় পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হওয়ার চাপ তৈরি হয়। আবার সন্তান লালন-পালনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সামাজিক উৎসাহও তুলনামূলক কম থাকে। ফলে দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে উঠতে বাধা সৃষ্টি হয়।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সৌদামিনি আলি খানের মতে, সন্তান জন্ম দেন দুজন মানুষের সিদ্ধান্তে, কিন্তু ভালো অভিভাবক হওয়ার পরীক্ষাটি যেন শুধু নারীকেই দিতে হয়।
বাবারা সন্তানের দেখভালে সামান্য অংশ নিলেও প্রশংসিত হন, অথচ মায়ের জন্য সেটিই স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক পরিবারে সন্তান লালন-পালনকে আর শুধু মায়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কর্মজীবী পরিবারের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবা উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণই শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলছে, শিশুর বেড়ে ওঠায় মা-বাবা উভয়ের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মা নন, বাবাসহ সব পরিচর্যাকারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ শিশুর মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে পরিবারবান্ধব নীতিমালা, যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের মতে, যৌথভাবে সন্তান লালন-পালনের সংস্কৃতি শিশুর সুস্থ বিকাশের পাশাপাশি পরিবারে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই চিত্র বদলাচ্ছে। শহরাঞ্চলের অনেক পরিবারে বাবারা এখন সন্তানের স্কুলে যাওয়া-আসা, পড়াশোনা, খাবার তৈরি কিংবা চিকিৎসার দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ পরিবারে সন্তানের প্রধান পরিচর্যাকারী হিসেবে এখনো মাকেই দেখা হয়। ফলে চাকরি, সংসার এবং সন্তান—তিনটি দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর চাপ বেশি পড়ে নারীদের ওপর।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সন্তান লালন-পালন কোনো একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়। মা ও বাবা—দুজনেরই সমান অংশগ্রহণ একটি শিশুর আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে পরিবারে দায়িত্বের ভারসাম্যও তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, বিতর্কের মূল প্রশ্ন নারীরা ‘বিশেষজ্ঞ মা’ হতে পারবেন কি না, তা নয়। বরং কেন সমাজ এখনো একইভাবে পুরুষদের ‘বিশেষজ্ঞ বাবা’ হওয়ার প্রত্যাশা করে না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
পরিবর্তিত সময়ে তাই অনেকেরই প্রশ্ন—সন্তান যদি দুজনের হয়, তাহলে ভালো অভিভাবক হওয়ার দায়িত্বও কি দুজনের সমান হওয়া উচিত নয়?
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/178954