ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও কমছে না নগদের ব্যবহার
করতোয়া ডেস্ক : দেশের ব্যাংক খাতে বড় ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি ছোট ঋণের গ্রাহকদের মধ্যেও খেলাপি হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে এক কোটি টাকার কম ঋণ নেওয়া সিএমএসএমই, কৃষি, ব্যক্তিগত ও আবাসন খাতের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে এ প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণির খেলাপি গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৪ লাখ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের খেলাপি গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৫ জন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার ৩২৩।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, এসএমই কার্যক্রমের মন্থর গতি এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার আয় কমে যাওয়ায় ছোট ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। ফলে খুচরা ঋণের গুণগত মানও অবনতি হচ্ছে। যদিও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেশি, তবে ছোট ঋণে দ্রুত খেলাপি বৃদ্ধি পুরো ব্যাংক খাতের জন্য সতর্কবার্তা বলে উল্লেখ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সার্বিক খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের মোট স্থিতি ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যার ১৫ শতাংশ খেলাপি। অন্যদিকে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এই শ্রেণিতে খেলাপির হার সর্বোচ্চ, প্রায় ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরে এ শ্রেণির খেলাপি গ্রাহক এক হাজার ৪৭৮ জন থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৫ জনে পৌঁছেছে। এছাড়া এক থেকে ১০ কোটি টাকা ঋণে খেলাপির হার ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ, ১০ থেকে ২০ কোটি টাকায় ৪৫ শতাংশ, ২০ থেকে ৩০ কোটিতে প্রায় ৩৬ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটিতে প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণে প্রায় ৪৫ শতাংশ খেলাপি।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি। মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ এ খাতে বিতরণ হলেও এর প্রায় ৪৪ শতাংশ এখন খেলাপি। সিএমএসএমই খাতে খেলাপির হার ৩৪ শতাংশ, যার মধ্যে কুটির শিল্পে এ হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। শিল্প খাতে খেলাপির হার প্রায় ৩২ শতাংশ, নির্মাণ ও কৃষি খাতে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ভোক্তা ঋণে খেলাপির হার ৭ শতাংশ। তবে কৃষিঋণে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক থাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তথ্য বলছে, তাদের খেলাপিগ্রাহক এক বছরে ২৪ লাখ থেকে কমে ২০ লাখে নেমেছে। যাদও ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৩৮ শতাংশ এখনো খেলাপি।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়লেও কমছে না নগদের ব্যবহার : দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি বাড়লেও নগদ টাকার ব্যবহার কমার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুন ও জুলাইয়ে এই অঙ্ক আরও বেড়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার নগদের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংকিং খাতের প্রতি আস্থার ঘাটতির কারণে নগদ অর্থের ব্যবহার এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকের বাইরে থাকলে তা ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বাভাবিক অর্থপ্রবাহে যুক্ত হয় না। এতে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যায়। পাশাপাশি কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত আয় ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির বিস্তারের ঝুঁকিও বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১১ সালে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। সময়ের সঙ্গে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২১ সালের জুনে ২ লাখ ৯ হাজার কোটি, ২০২২ সালে ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি এবং ২০২৩ সালে প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে। গত বছরের জুনে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে চলতি বছরের মে মাসেই ৩ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/178752