বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক দিন আজ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক দিন আজ

করতোয়া বিনোদন : আজ ৩ আগস্ট বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৫৬ সালের এই দিনে মুক্তি পায় দেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’। 

১৯৫৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। তখন পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, পশ্চিম পাকিস্তান ও হলিউডের ছবি চলত। এ সময় এক সভায় গুলিস্তান সিনেমা হলের অবাঙালি মালিক খান বাহাদুর ফজল আহমেদ বলেন, 'পূর্ব পাকিস্তানের আর্দ্র আবহাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব নয়।' এ কথার তীব্র প্রতিবাদ করে আবদুল জব্বার খান বলেন, এখানে তো ভারতীয় ছবির শুটিং হয়েছে। তবে কেন পূর্ণাঙ্গ ছবি নির্মাণ করা যাবে না? এ নিয়ে চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেন আবদুল জব্বার খান । ঢাকার প্রথম বাংলা ছবি নিমার্ণের লক্ষ্যে উঠে পড়ে লাগেন। 'ডাকাত' নামে একটি নাটক ছিল তার। সেই নাটক থেকেই সিনেমার শুটিং শুরু হয়। পরে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফজল শাহাবুদ্দিনের পরামর্শে ছবিটির নাম দেন 'মুখ ও মুখোশ'। এ ছবি নির্মাণে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। ছবির কাজ শুরু হয় ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে। আর শেষ হয় ১৯৫৫ সালের ৩০ অক্টোবর।

ছবি নির্মাণের মতো ব্যয়বহুল কাজ হাতে নিয়ে বেশ বিপাকে পড়ে যান আব্দুল জব্বার খাঁ। কোথায় পাবেন ছবির প্রয়োজনীয় অর্থ। নিজেরও তো সেরকম সামর্থ্য নেই। তাহলে বন্ধ হয়ে যাবে কি ছবি নির্মাণ?  এমন দোলাচলে এগিয়ে আসেন সংস্কৃতিপ্রেমী কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু মিয়া। ছবি নির্মাণে ওই সময়ে খরচ হয় প্রায় ৮২ হাজার টাকা। যার অর্ধেক দেন দুদু মিয়া। আর বাকি অর্ধেক খরচ বহন করেন আব্দুল জব্বার খাঁ ও তার চার বন্ধু। কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু মিয়া হলেন জনপ্রিয় নায়ক আলমগীরের বাবা। ছবিটি মুক্তির প্রথম দিকেই আয় হয় ৪৮ হাজার টাকা। পরে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও টিভিতে সম্প্রচারে আয় হয় আরও কিছু অর্থ।

বহুল আলোচিত এই ছবির শুটিং লোকেশন ছিল ঢাকা কেন্দ্রিক। এর কারণ স্বল্প বাজেট। এছাড়া প্রথম ছবি বলে কথা। তাই পরীক্ষামূলক কাজ হিসেবে ঢাকা ও আশপাশ এলাকাকে শুটিং লোকেশন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঢাকার তেজগাঁও, কালীগঞ্জ রাজারবাগ, কমলাপুর, লালমাটিয়া, সিদ্ধেশ্বরী, জিঞ্জিরা ও টঙ্গী ছিল ছিবিটির শুটিং স্পট। 

অসামাজিক কর্মকাণ্ড, পারিবারিক কলহ ও দুর্নীতির মতো বিষয়বন্তু নিয়ে 'মুখ ও মুখোশ' নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র এটি। এর দৈর্ঘ্য ৯৯ মিনিট। অনেক চড়াই-উৎরাই পারি দিয়ে অবশেষে ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট ছবিটি মুক্তি পায়। ছবির প্রথম প্রদর্শনী রূপমহল সিনেমা হলে উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তৎকালীন পুরান ঢাকার 'মুকুল' সিনেমা হলে ছবিটির শো চলে। পরে ছবিটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। 

এরপর 'মুখ ও মুখোশ' নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বাংলার নিজস্ব ছবি দেখার জন্য সিনেমা হলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে দর্শক। বাঙালিদের মধ্যে সিনেমা নিয়ে আবেগ ও উত্তেজনা আরো বেড়ে যায়। সিনেমা শুধু বিনোদন নয়,  প্রতিবাদে হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

আব্দুল জব্বার খাঁ ১৯১৬ সালে ২১ এপ্রিল মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন পার করে ১৯৯৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি না ফেরার দেশে চলে যান।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/178583