জয়পুরহাটের কালাইয়ে খাল খনন নকশার সাথে মিল নেই, কাজের শ্রমিকের পরিবর্তে এস্কেভেটর
কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি : জয়পুরহাটের কালাইয়ে কানমনা-হারাবতি খাল খনন কাজে ১৮০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে খনন কাজে একজন শ্রমিকেরও পা পড়েনি ওই খালে! সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী দারিদ্রতা বিমোচনের জন্য খনন কাজের অন্তত ৫০ শতাংশ এলাকার হতদরিদ্র শ্রমিকদের হাতে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
স্থানীয় দিনমজুরদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করে ৬টি এক্সেভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে চালানো হয়েছে নামমাত্র খননকাজ। কালাই উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’ এর আওতায় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকায় কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে এমন চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছে স্থানীয় ‘কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড নামের একটি সমিতি।’ উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কানমনা-হারাবতী খালের রোয়াইর সুইচগেট থেকে বানদীঘি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য প্রথম দফায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে একই খালের বাকি ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য দ্বিতীয় দফায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দুই অর্থবছরেরই ওই খাল খনন কাজ করেছে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি।
কালাইয়ের সাঁতার গ্রামের হারাবতী খালের সংযোগ থেকে ইন্দাহার গ্রাম পর্যন্ত ৪,৬৮০ মিটার (প্রাক্কলিত মূল্য ৫৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা)। আবার বানদীঘি গ্রামের ব্রিজের অংশ থেকে গোবিন্দগঞ্জ সীমান্তবর্তী ১২২৫ মিটার পর্যন্ত (প্রাক্কলিত মূল্য ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯২০ টাকা)।
প্রকল্পটির কাজ চলতি বছরের ১৫ মার্চ শুরু হয়ে ৩১ মে’র মধ্যে শেষ হয়। এলজিইডি’র অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাটিং ডেপথ (গভীরতা) সর্বনিম্ন ৪ ইঞ্চি থেকে সর্বোচ্চ ২৪ ইঞ্চি। খালের তলার দৈর্ঘ্য ১০ থেকে ১১.৫ ফুট। খালের উপরিভাগের দৈর্ঘ্য ২২ থেকে ৩২ ফুট। এবং গভীরতা ৮.৫ থেকে ১১ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নথিপত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোন মিল নেই।
মাত্রাই মুন্নাপাড়ার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, এস্টিমেট অনুযায়ী কাজের কাজ কিছুই হয়নি। খালের ভেতরে উঁচু হয়ে থাকা কিছু জায়গার মাটি কেবল তুলে দেওয়া হয়েছে। চারপাশ সমানভাবে খনন করা হয়নি। খালের পাড়ের ঘাসগুলো শুধু চেঁছে দিয়ে ঢালু করা হয়েছে। আর কোনো টেন্ডার ছাড়াই পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। বাধা দিলে ভয়ভীতি দেখায়। বাধ্য হয়ে সবাই চুপচাপ দেখেছে কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করেনি।
মোনোয়ার হোসেন নামে আরেকজন বলেন, কোটি টাকার প্রকল্প হলেও খালে কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। ৬টি এস্কেভেটরের তান্ডবে গরিবের পেটে লাথি মারা হয়েছে। গভীরতা বা চওড়া কিছুই বাড়ানো হয়নি। দায়সারা কাজ করায় প্রথম বর্ষাতেই মাটি ধসে খাল আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে। সরকারের এতগুলো টাকা খরচ হলেও কৃষকরা কোনো সুফল পাচ্ছে না। আমরা চাই প্রকল্পের প্রতিটি অংশের কাজ নতুন করে মাপা হোক।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খালের মধ্যে পানি জমে যাওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মূল খনন কাজ এড়িয়ে কেবল কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার করে পুরো কাজ শেষ দেখানোর পাঁয়তারা চলছে। অথচ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সমিতির এক সদস্য এবং এলজিইডি কালাই কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কাগজে-কলমে কাজ দেখানো এবং ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পথ সুগম করতে ১৮০ জন ভুয়া শ্রমিকের তালিকা তৈরি করে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী (এক্সচেঞ্জ) কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পে শ্রমিকদের ব্যবহার না করার সত্যতা ও মেশিন দিয়ে কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তদারকি কর্মকর্তা এলজিইডি’র সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর। তিনি বলেন, প্রকল্পে শ্রমিকদের ব্যবহার করা হয়নি এটা সত্য, পুরোকাজ ৬টি ভেকু মেশিন দিয়ে করা হয়েছে। অন্য বিষয়গুলো ঠিক আছে। ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
নকশা সাথে মিল নেই কাজের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও নকশা অনুসারেই কাজ করা হয়েছে। মেশিন ও শ্রমিকের সমন্বয়ে কাজ শেষ করা হয়েছে, এলাকাবাসীর অভিযোগ সত্য নয়।
কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, খাল খননের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সাথে তদারকি করছি। কাজ শেষ হওয়ার পর ‘পোস্ট ওয়ার্ক’ মেজারমেন্ট অনুযায়ী কাজ মেপে বাকি বিল প্রদান করা হবে। কম কাটা হলে বিল কম দেওয়া হবে। আর শ্রমিকের তালিকা এক্সচেঞ্জ অফিসে ফরোয়ার্ড করা হয়েছে, তাই সেটি আমাদের অফিসে সংরক্ষিত নেই।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/178425