বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ভাইকে হারিয়ে আজও চলছে বোনের নীরব কান্না
দুপচাঁচিয়া (বগুড়া) প্রতিনিধি : বগুড়া দুপচাঁচিয়া উপজেলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে একই সাথে অংশ নিয়ে ভাই মনিরুল ইসলাম মুনিরকে (২৩) হারিয়ে বোন নাফিসা খাতুন ঘটনার ২ বছর পর আজও চলছে নীরব কান্না।
দুপচাঁচিয়া উপজেলা থানা বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বে কাহালু উপজেলার বীরকেদার গ্রামের মনিরুল ইসলাম মুনির। তার বাবা শামছুল হকের এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। ছেলে-মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে সৎ মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে মুনিরকে নওগাঁ বদলগাছি উপজেলার সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি করে দেন।
মুনির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। আর একমাত্র মেয়ে নাফিসা খাতুন বগুড়া সরকারি আজিজুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। নাফিসা খাতুন জানান, তার ভাই মুনির ছোটবেলা থেকেই সামাজিক কাজে জড়িত ছিলো। পড়ালেখার পাশাপাশি সে টিউশনি করতো। বাবার কৃষি কাজেও সহযোগিতা করতো।
এলাকার অস্বচ্ছল ও অসহায় মানুষকে সহায়তার জন্য ২০২৩ সাথে সামাজিক স্বেচ্ছাসেবামুলক সংগঠন “হিকমা ইয়ুথ সোসাইটি ফাউন্ডেশনের” সাথে জড়িয়ে সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ এর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে জুলাইয়ের শুরুতেই কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে মুনির তাতে অংশগ্রহণ করে এবং তার বোন নাফিসা খাতুনকেও অংশ নিতে বলে।
২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপচাঁচিয়া জাহানারা কামরুজ্জামান কলেজে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সমাবেশ শেষে কোটা বিরোধী আন্দোলনে মিছিলে অংশগ্রহণ করে। ওইদিন সিও অফিস বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশের সাথে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পুলিশ খুঁজছে এমন খবর পেয়ে বাবা মুনিরকে বাড়ি আসতে নিষেধ করলে সে কাহালু পাইকড় গ্রামে তার নানার বাড়িতে চলে যায়। নানার বাড়ি থেকেই দুপচাঁচিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়। ঘটনার দিন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রোববার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে মুনির দুপচাঁচিয়ায় আসে।
এসময় মুনির তার বোন নাফিসা ও তার বান্ধবীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে বলে। নাফিসা খাতুন ভাইয়ের ডাকে সারা দিয়ে বান্ধবীদের নিয়ে দুপচাঁচিয়ায় আসে এবং ভাইয়ের হাত ধরেই মিছিলের সামনে থেকে আন্দোলনে অংশ নেয়। ওই দিন দুপুর ১১টায় থানার সামনে দিয়ে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় সংঘর্ষ হয়। এতে মুনিরুল ইসলাম মুনির গুলিবিদ্ধ হয়।
সহপাঠীদের সাথে আহত ভাইকে দুপচাঁচিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। ভাইয়ের সাথে স্মৃতি বিজড়িত ঘটনাগুলো বলতে গিয়ে সে বার বার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
তার বাবা শামছুল হক জানান, ঘটনার দিন ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট রোববার আনুমানিক দুপুর ১২টায় তার ভাগনে আব্দুল্লাহর মাধ্যমে একমাত্র ছেলে মুনিরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবরটি জানতে পারেন। সে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো না। শিক্ষার্থীদের নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলো।
দুপচাঁচিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে গুলিবিদ্ধ ছেলের নিথর দেহ দেখতে পান। পরে বাড়িতে নিয়ে এসে সন্ধ্যায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করেন। ঘটনার ২ বছর পরও ছেলে হত্যার বিচারের অপেক্ষা করছেন। গতকাল শুক্রবার দুপচাঁচিয়া উপজেলা জামায়াত এর আয়োজনে সংগঠনের কার্যালয়ে স্মরণসভাসহ দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি উপস্থিত থেকে ছেলের জন্য দোয়া চেয়েছেন।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/178318