ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় নাকাল রাজধানীবাসী, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি
শেখ শাহরিয়ার হোসেন : রাজধানী ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলে দিন দিন বাড়ছে জনভোগান্তি। প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, স্কুল-কলেজের সামনে, ফ্লাইওভার ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় সবখানেই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে এসব যান। এতে একদিকে যেমন তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে দুর্ঘটনা, ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধের ঝুঁকি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা চালুর পর সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, স্টপলাইন ভঙ্গ ও হঠাৎ লেন পরিবর্তনের মতো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা কমেছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অধিকাংশের নিবন্ধন, নম্বরপ্লেট ও চালকদের বৈধ লাইসেন্স না থাকায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও কার্যকর হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের সবুজ সংকেত মিললে প্রথম ধাপে ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হবে। আগামী মাসের মাঝামাঝি এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। বেসরকারি হিসাবে বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ১২ লাখ রিকশা চলাচল করে, যার বড় একটি অংশ ব্যাটারিচালিত।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে মাত্র প্রায় ২৫ হাজার রিকশার। রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ রিকশাই আশপাশের জেলা থেকে ঢাকায় প্রবেশ করে। দুর্ঘটনার চিত্রও উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৯ মাসে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ১ হাজার ২৫৯ জন নিহত এবং ৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা নেই। শিশু-কিশোর এবং অন্য পেশা থেকে আসা অনেকেই কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই অটোরিকশা চালাচ্ছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, গত জুন মাসে ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান দূর্ঘটনায় ১১২ জন মৃত্যুবরণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরাধীরা কখনও যাত্রীর, আবার কখনও চালকের ছদ্মবেশে এসব যান ব্যবহার করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
রাজধানীর ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা ফজলে রাব্বি বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে আমাদের প্রতিদিনই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যেখানে- সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা, বেপরোয়া গতিতে চলাচল আর ট্রাফিক আইন না মানার কারণে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনাও বাড়ছে। তবে শুধু অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। চালকদের প্রশিক্ষণ, বৈধ লাইসেন্স ও নিবন্ধনের আওতায় এনে নির্দিষ্ট রুটে অটোরিকশা চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারকে এমন একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অটোরিকশাচালকদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
এদিকে প্রতিদিনই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ। ডিএমপির তথ্যমতে, প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে, ব্যাটারি জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রধান সড়কে এসব যান ওঠা ঠেকাতে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “অটোরিকশাকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় এনে নিবন্ধন ও নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষা-সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অতীব জরুরি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের দপ্তরের (ট্রাফিক) এক কর্মকর্তা বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিদিনই ব্যাপক ডাম্পিং অভিযান পরিচালনা করছি। ডাম্পিং করা অটোরিকশাগুলো সাধারণত দুই সপ্তাহ পরপর সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সেই স্থানেই নতুন করে জব্দ করা অটোরিকশাগুলো রাখা হয়।
তবে প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের ডাম্পিং স্টেশনের সংখ্যা ও ধারণক্ষমতা একেবারেই অপ্রতুল। একটি বড় জায়গায় নতুন ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে উপযুক্ত স্থান খুঁজছি, কিন্তু এখনো তা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান দৈনিক করতোয়াকে বলেন, গত রোববার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে অটোরিকশা পরিচালনার বিদ্যমান নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নীতিমালার পরিবর্তন কার্যকর হলে রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল অনেকটাই কমে আসবে এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/177947