বগুড়া হিজড়াদের গ্রুপিংয়ে আটকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগ

বগুড়া হিজড়াদের গ্রুপিংয়ে আটকা সমাজসেবা অধিদপ্তরের আত্মকর্মসংস্থানের উদ্যোগ

শহর প্রতিনিধি : বগুড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবনযাপন নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের জেরে অন্তঃকোন্দল এবং জনঅসন্তোষের মতো নেতিবাচক খবর প্রায়ই আলোচনায় আসে তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষদের নিয়ে। সরকারি নানা উদ্যোগ ও সামাজিক সহায়তায় অনেকেরই স্বাভাবিক ও স্বাবলম্বী হওয়ার খবরও রয়েছে।

জানা গেছে, সরকার ২০১৪ সালে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্যমতে, বগুড়ায় নিবন্ধিত হিজড়ার সংখ্যা ৩৪৭ জন। বাস্তবে এ সংখ্যা কমপক্ষে দেড় হাজার বলে দাবি করেছেন, বগুড়ার ‘গুরু মা’ কনা হিজরা।

জানা গেছে, তৃতীয় লিঙ্গের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে বাড়ি-বাড়ি, দোকান ও অনুষ্ঠানে জোরপূর্বক টাকা আদায় এবং এ নিয়ে বিবাদের অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনাও রয়েছে। মহাস্থানে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন আহতও হন।

মহানগরের হাড্ডিপট্টি এলাকায় তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর স্বাক্ষরতা ও স্বশিক্ষায় তাদের নিবন্ধিত ‘বলাকা হিজড়া উন্নয়নসংস্থা’র মাধ্যমে একটি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অর্থ সংগ্রহ করে নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার নামে আসল-নকল উভয় হিজড়াদের কাছ থেকেই টাকা আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আবার চাঁদাবাজি থেকে সরে এসে অনেকেই উদ্যোক্তা ও সাধারণ পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। কাহালু উপজেলার খায়রুল সুন্দরীর মতো অনেকেই বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় ‘বন্ধু চুলার’ ব্যবসা বা কারিগরি কাজ শিখে আত্মনির্ভরশীলতা দেশব্যাপী আলোচিত হন।

এছাড়া অনেক বেসরকারি, ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পাশাপাশি সরকারিভাবে পঞ্চাশ বছরের ঊর্ধ্বে ৩১৬ জন হিজড়া প্রতি মাসে ছয়শ’ টাকা করে ভাতা পান। বগুড়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩১ জন শিক্ষার্থী প্রতি মাসে ৭শ’ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত শিক্ষাভাতা পেয়ে থাকেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হিজড়াদের ‘গুরু মা’ কনা হিজড়া বলেন, প্রায় তিনশ’ মেয়েকে নিয়ে এই শহরে অত্যন্ত মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করছি। মারামারি, চাঁদাবাজি এসব করে নকল হিজড়ারা। আমরা মানুষের বাসা বাড়িতে, দোকানে সহযোগিতা কামনা করি।

বিয়ে-শাদির মতো অনুষ্ঠানে আমরা গিয়ে সহযোগতিা চাই, কোন চাঁদাবজি বা জোড়পূর্বক কোন টাকা দাবি করি না। এসব অপকর্ম করে বগুড়া থেকে বিতাড়িত হয়েছে, খাজা ওরফে গুরু মা সুমি হিজড়া ও তার বাহিনী।

প্রশিক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ সালে সমাজসেবা থেকে প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণকালীন ভাতাও দেওয়া হয়। এরপর কোন ট্রেনিং বা আত্মকর্মসংস্থানমূলক কোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। আমরা যারা প্রকৃত হিজড়া রয়েছি তাদের জন্য আবারও সরকারি প্রশিক্ষণ, ভাতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ আবাসন সুবিধা আবার চালু করা হোক।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বগুড়া সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আমাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সনদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমরা জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য সংশোধন করতে পারি না। ব্যাংকের এ্যাকাউন্ট, মোবাইলের সিম কিনতে, সরকারি চিকিৎসা সেবা পেতে বা যেসব কাজে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয় সেসব জায়গায় আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখালে উল্টো হেনস্তা হতে হয়।

মোট ৩৪৭ জন শনাক্তকৃত হিজড়ার তথ্য নিশ্চিত করে বগুড়া জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহা. আতাউর রহমান বলেন, সর্বশেষ ২০২৬ সালে সরকারিভাবে হিজড়া শনাক্তকরণ কার্যক্রম সম্পন্নের তাগিদ আসে কেন্দ্রীয়ভাবে। কিন্তু বগুড়ার ‘হিজড়া’ দাবি করা সকল গোত্র প্রধান ও বিভিন্ন উপায়ে তাদের ডাকা হলে তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে হিজড়া সনদ নিতে অনীহা প্রকাশ করেন।

এই কারণে ২০২১ সালে তাদের আত্মকর্মসংস্থান ও মানোন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ফেরত পাঠানো হয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রতিদিন ৫শ’ টাকা ভাতা ও খাবার বরাদ্দ ছিল তাদের জন্য। সে সময় তারা সমাজসেবায় জানিয়েছিলেন, তারা এর চাইতে বেশি টাকা প্রতিদিন রোজগাড় করেন, এমন কম ভাতার প্রশিক্ষণ নেবেন না।

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/177867