তরুণদের আচরণে বাড়ছে উদ্বেগ , প্রযুক্তির ব্যবহার নাকি পারিবারিক শিক্ষার অভাব
শেখ শাহরিয়ার হোসেন: রাজপথ দখল করে নানামুখী আন্দোলন, সামাজিক ইস্যু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’র একাংশের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মত প্রকাশে অসহিষ্ণুতা, ভিন্নমত সহ্য না করা, আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার এবং ছোটখাটো বিষয়েও সংঘাতমুখী আচরণের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত নানা পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব।
তারা বলেন, কৈশোর ও তারুণ্য এমন একটি সময়, যখন একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং সামাজিক আচরণ গড়ে ওঠে। এ সময় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা না পেলে তরুণদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং উগ্র আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে তরুণদের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি বিভ্রান্তিকর তথ্য, ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্টের সংস্পর্শেও তারা বেশি আসছে। দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে যুক্তিনির্ভর আলোচনার পরিবর্তে আবেগনির্ভর অবস্থানকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া সমাজে ভোগবাদী মানসিকতার বিস্তার, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের অবক্ষয়ও তরুণদের আচরণে প্রভাব ফেলছে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও দুই সন্তানের অভিভাবক নাছিমা মীম বলেন, বর্তমান সময়ে বাবা-মা দুজনই কর্মব্যস্ত থাকায় সন্তানদের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটানো সম্ভব হয় না। অনেক সময় মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেটই তাদের প্রধান সঙ্গী হয়ে ওঠে।
সন্তানদের শুধু ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের মানসিক অবস্থা বোঝা এবং নৈতিক মূল্যবোধ শেখানোর দায়িত্বও পরিবারকেই নিতে হবে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শওকত হোসেন বলেন, বর্তমান তরুণদের মধ্যে উগ্র আচরণের পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার একসঙ্গে কাজ করছে। সমাজে ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার, অভিভাবকদের অর্থকেন্দ্রিক ব্যস্ততা এবং সন্তানদের সঙ্গে সময় না কাটানোর কারণে পরিবারে মানসিক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার এবং শিক্ষাক্রমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়াও তরুণদের আচরণগত পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তিনি বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, বরং একজন দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মদ বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্মের আচরণগত পরিবর্তনের অন্যতম কারণ একক বা ছোট পরিবারের আধিক্য। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার ফলে শিশুরা দাদা-দাদি, কাকা, ফুফু কিংবা পরিবারের অন্য প্রবীণ সদস্যদের সান্নিধ্য ও শাসন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে সামাজিক মূল্যবোধ, বড়দের সম্মান করা, সম্পর্কের মর্যাদা বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মতো সামাজিক আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা যথাযথভাবে শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার অতিবাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে দুর্বল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় আন্তরিকতা ও সময়ের অভাবও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি করছে, যা তাদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) সাদ্দাম হোসেন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রচলিত আইন, পরিস্থিতির বাস্তবতা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করি। জনসমাগম, আন্দোলন বা মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কৌশল ও নির্দেশনা অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করা হয়।’
যশোর জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম দৈনিক করতোয়াকে বলেন, তরুণরা তাদের দাবি আদায়ে আন্দোলন করে। দেশে কোনো আন্দোলন হলে কিছু মহল সেখানে ঢুকে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করে। গত বুধবার কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। সেখানে কিছু শিক্ষার্থীর আচরণ ও ভাষা ব্যবহার ছিল খুবই অমার্জনীয়। তবুও তাদের বুঝিয়ে আন্দোলন থেকে বিরত রাখার প্রয়াস করেছে আইনশৃক্সক্ষলাবাহিনী। আমরা মনে করি তারা আমাদেরই সন্তান। তাদের বুঝাতে হবে কোনটি ন্যায্য দাবি এবং তা নিয়ে কতটুকু আন্দোলন করা উচিত। এ বিষয়ে পরিবার ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিয়ে তাদের এ সব বিষয়ে পরামর্শ দিতে হবে। তাহলে আমাদেরও কাজ সহজ হয়ে যাবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/177399