পাবনার নিরাপদ খাবার পানির সংকট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে উপজেলার ৩ লাখ মানুষ
বেড়া (পাবনা) প্রতিনিধি: পাবনার বেড়া উপজেলায় নিরাপদ খাবার পানির সংকট দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। ১৯৯৩ সালে দেশে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক শনাক্ত হওয়ার পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) নিরাপদ পানির কার্যক্রম জোরদার করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০২-২০০৩ অর্থবছর থেকে বেড়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন, আর্সেনিক আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট (আরআইপি) নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও দুই দশকের বেশি সময় পরও উপজেলার অনেক এলাকায় এখনও আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত নিরাপদ পানির সংকট কাটেনি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আগে যেখানে গভীর স্তরের পানি নিরাপদ বলে মনে করা হতো, এখন ৯শ’ থেকে ১ হাজার ফুট গভীরতায় স্থাপিত নতুন নলকূপেও আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার জনসংখ্যার এই উপজেলায় নিরাপদ পানির সংকটের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিকজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া, কৈটোলা, চাকলা, নতুন ভারেঙ্গা, জাতসাখিনী, পুরান ভারেঙ্গা, রূপপুর, মাসুমদিয়া, ঢালারচর ইউনিয়ন এবং বেড়া
পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ১০টি পরিবারের জন্য একটি করে মোট ১২৪টি কমিউনিটি ভিত্তিক গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৭টিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। প্রতিটি নলকূপ স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। সে হিসেবে ওই প্রকল্পে সর্বমোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১১ কোটি টাকা। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে জনসংখ্যাভিত্তিক স্থাপিত এসব নলকূপের প্রায় ৮৫ শতাংশের পানি আর্সেনিক ও আয়রনমুক্ত পাওয়া গেছে, যার মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০টি পরিবার সরাসরি নিরাপদ সুপেয় পানির সুবিধা ভোগ করছেন।
এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ২২০ ফুট গভীরতায় ৭২টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল। পরীক্ষায় দেখা যায়, এর মধ্যে ৭০টি নলকূপের পানিতে আর্সেনিক শনাক্ত হয়; নিরাপদ ছিল মাত্র দুটি। এ তথ্য ইঙ্গিত করছে, ভূগর্ভস্থ পানির গভীর স্তরেও আর্সেনিকের বিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের নলকূপে কম-বেশি আর্সেনিক রয়েছে। বিশেষ করে অগভীর নলকূপগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক নলকূপে লাল সতর্কীকরণ চিহ্ন থাকলেও বিকল্প পানির ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে সেই পানিই ব্যবহার করছেন।
ডিপিএইচইর তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মাসুমদিয়া ইউনিয়ন ও বেড়া পৌর এলাকার সানিলা মহল্লা সবচেয়ে বেশি আর্সেনিকপ্রবণ এলাকা। অন্যদিকে উপজেলার ঢালারচর তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ। ৫০০ ফুট গভীরতায় ঢালারচর ছাড়া উপজেলার প্রায় সব এলাকাতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
২০০৪ সালে আর্সেনিক সমস্যা মোকাবিলায় উপজেলায় ৫০টি আর্সেনিক আয়রন রিমুভাল প্ল্যান্ট (আরআইপি) স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে মাত্র ১০টি সচল রয়েছে। বাকি ৪০টি প্ল্যান্ট অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় হাজারো মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বেড়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ঢালারচর ইউনিয়ন ও চরাঞ্চল ছাড়া বেড়া উপজেলার প্রায় সব ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকার অগভীর পানিস্তরে নিরাপদ পানির সংকট রয়েছে। চলতি অর্থবছরে নতুন প্রকল্প ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংকটপূর্ণ এলাকাগুলোতে আরও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/177387