দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ: আধিপত্য নয়, সহযোগিতার নতুন ভূরাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ: আধিপত্য নয়, সহযোগিতার নতুন ভূরাজনীতি

দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এমন একটি সময় ছিল, যখন এই অঞ্চল কেবল জনসংখ্যার দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক শক্তি, উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। মুঘল আমলে বাংলা সুবা ছিল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। মসলিন, সুতি বস্ত্র, রেশম, শোরা (ঝধষঃঢ়বঃৎব), কৃষিপণ্য এবং নৌবাণিজ্যের জন্য বাংলা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদদের গবেষণা অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশ বৈশ্বিক উৎপাদন ও অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে ভারতীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য এ অঞ্চলে আনতে হতো। কিন্তু ইতিহাসের চাকা এক জায়গায় স্থির থাকে না। রাজনৈতিক বিভক্তি, মুঘল সাম্রাজ্যের অবক্ষয় এবং পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। শিল্পের অবক্ষয়, সম্পদের বহিঃপ্রবাহ এবং বৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক অর্থনীতি একসময়ের সমৃদ্ধ অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দেয়। ইতিহাসের এই অধ্যায় কেবল অতীতের বেদনা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। আজ দক্ষিণ এশিয়া আবার একটি নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বৃহত্তম যুব জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই অঞ্চলে বাস করে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের নতুন সুযোগ এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা সঠিক নীতি ও নেতৃত্বের মাধ্যমে এই অঞ্চলকে আবারও বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গতিপথ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে। যদি ভারতের নতুন প্রজন্ম গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, উদ্ভাবন, শিক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মতো বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়, তবে তার ইতিবাচক প্রতিফলন পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে দেখা যেতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোনো একক রাষ্ট্রের প্রাধান্যের ওপর নির্ভর করতে পারে না; এটি নির্ভর করবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতার স্বীকৃতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর। আধিপত্যের রাজনীতি স্বল্পমেয়াদে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলে সহযোগিতা, আস্থা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব।

আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা যদি বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো, শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো অভিন্ন স্বার্থে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ইউরোপের অভিজ্ঞতা দেখায়, অতীতের সংঘাত ভবিষ্যতের সহযোগিতার পথে চিরস্থায়ী বাধা নয় যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

দক্ষিণ এশিয়ার আগামী দিনের নেতৃত্বের সামনে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে আমরা কি অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অবিশ্বাসের রাজনীতি আঁকড়ে ধরে থাকব, নাকি একটি সহযোগিতামূলক আঞ্চলিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করব ? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু কোনো একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বরং প্রভাব ফেলবে প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জীবন, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের ওপর। ইতিহাস আমাদের অতীতের গৌরবের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে বর্তমানের প্রজ্ঞা। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্ম যদি উদারনীতি, সুশাসন, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এই অঞ্চল আবারও বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও মানবিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আধিপত্যে নয়; তার ভবিষ্যৎ নিহিত সহযোগিতায়। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই।  

 

লেখক :

সাজিদ ওয়াসিক বাঁধন

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/177351