বার্ধক্যে বৃদ্ধাশ্রম, না স্বজন সান্নিধ্যের ছোঁয়া

বার্ধক্যে বৃদ্ধাশ্রম, না স্বজন সান্নিধ্যের ছোঁয়া

আনন্দময় শৈশব, কৈশোর ও যৌবন পেরিয়ে আসার পর জীবনের এক অনিবার্য অধ্যায়ের নাম বার্ধক্য জীবন, যখন একজন বয়োবৃদ্ধের থাকে না শারীরিক ক্ষমতা, থাকে না মনোবল। উপরন্তÍ যুক্ত হয় নানান অসুখ—বিসুখ আর পরিবারের সান্নিধ্যে থাকার ব্যাকুলতা। এক সময়ের যৌথ পরিবারে বয়স্ক  সদস্যদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দেয়া হতো। মিলতো যত্ন ও সম্মানও। পরবতীর্তে একটি বা দুটি সন্তান নিয়ে গড়ে ওঠা তিন—চারজনের  একান্নবতীর্ পরিবারে কর্মব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া ও সন্তানদের মানুষ করে তোলার প্রবল ভাবনা প্রাধান্য পেতে থাকায় কাজেকর্মে অক্ষম হয়ে পড়া বয়স্ক বাবা—মা’র প্রতি পরিবার প্রধানের মনোযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে,পড়ছে। এ বাস্তবতায় অনেকটা একা হয়ে পড়েন বৃদ্ধ বাবা—মা। অথচ জীবনের এই অধ্যায়ে এসে বয়স্ক মা—বাবা শিশুর মতো সারল্য নিয়ে প্রত্যাশা করেন সন্তানের একটু মনোযোগ, ভালোবাসা ও যত্ন; খেলার সাথী হিসেবে পেতে চান নাতিপুতিদের, হাসি আনন্দে কাটিয়ে দিতে চান জীবনের বাকিটা সময়। কিন্তু যে সন্তানদের সাথে পার করে আসা দীর্ঘদিনের চেনা পরিবার,তখন সেই সন্তানরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের নিজস্ব জীবনের হিসেব—নিকেশ নিয়ে। বিয়ের পরে মেয়ে সন্তানের তো তেমন সুযোগই থাকে না বাবা মায়ের পাশে দাঁড়ানোর।  বাবা—মার প্রত্যাশার হিসেবটা তখন আর মেলে না। মেলে না আরো কিছু কারণে। যেমন—অনেকের সন্তান উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে বিদেশে পড়তে বা চাকরি করতে  গিয়ে আর দেশে ফেরে না। বিদেশের আনন্দময় জীবন উপভোগ করতে গিয়ে দেশে থাকা বৃদ্ধ বাবা—মা’র কথা তখন তারা ভাবনাতেও রাখতে চায় না। কিছু ছেলে সন্তান স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের সুখ—স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে বা শ্বশুর—শাশুড়ির সেবা যত্নকে বোঝা মনে করা অমানবিক স্ত্রীদের প্ররোচনায় বৃদ্ধ বাবা—মা’র সাথে অন্যায় আচরণ করে বা অন্য কোন অজুহাত তৈরি করে তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়ে বা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আলাদা হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পারিবারিক বন্ধনও। অসহায় বাবা—মা’র জীবনে তখন নেমে আসে নিঃসঙ্গতার অন্ধকার। অথচ সন্তানরা ভুলে যায় যে—তাদের সমর্থ হয়ে ওঠার জীবন নির্মিতই হয়েছে বাবা—মা’র অমিত ভালোবাসা, সম্পদ, শক্তি ও নিঃস্বার্থ ত্যাগের মধ্য দিয়ে। তারা ভুলে যায়—বৃদ্ধ বাবা—মা’র শেষ জীবনে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনই হলো পরিবারের সান্নিধ্য ও ভালোবাসা। 

কিন্তু বর্তমানে দুভার্গ্যজনকভাবে আমরা লক্ষ করি—পশ্চিমা বিশ্বের অনুকরণে অনেক সন্তান ঝামেলাবিহীন সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের অমানবিক প্রত্যাশ্যায় সংসারে উচ্ছিষ্ট বলে মনে করা বৃদ্ধ বাবা—মাকে বৃদ্ধাশ্রমের মতো পারিবারিক সান্নিধ্যহীন এমন এক পরিবেশে ঠেলে দিচ্ছে,যা শুধু হৃদয় বিদারকই নয়,এক নির্মম অমানবিকতাও। সেখানে তাদের জীবনের সঙ্গি হয় একাকীত্ব,অযত্ন আর সন্তানের জন্য নিরন্তর অপেক্ষার হাহাকার। বিদ্যমান বেশ কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রমে সরেজমিন পরিদর্শনকালে এমন অনেক  করুণ চিত্রই উঠে এসেছে সামাজিক ও গণমাধ্যমে।

 বৃদ্ধাশ্রম কখনোই পরিবারের একান্ত আপনজনের পরিচযার্ ও সান্নিধ্যের বিকল্প হতে পারে না। সেখানে যত আধুনিক সুযোগ সুবিধাই থাকুক, সযত্নে লালন পালন করা সন্তান ও নাতিপুতির ভালোবাসা সেখানে মেলে না। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে—জীবনের সব পর্যায়ে বাবা—মা’কেই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা উচিত। পরিবারের সুখের জন্য বাবা—মা  কোন প্রতিবন্ধকতা নন বরং সুখের পরিপূরক। পরিবারের বিভিন্ন সংকটে তারা তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও পরামর্শ দিয়ে পরিবারে সুখের আবহ তৈরিতে ও পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করতে সহায়তা করতে পারেন। জীবনের এই পর্যায়ে সন্তান ও বৃদ্ধ বাবা—মাকে মেনে ও মানিয়ে নেয়ার মধ্যে যে পরম প্রশান্তি, তা অন্য কোথাও মেলার সুযোগ নেই। বুঝতে হবে—যে সন্তান আজ নিজের বাবা—মাকে বোঝা মনে করছে, একদিন সে—ও বৃদ্ধ হবে। সে নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করবে না যে তার পরিণতিও তার বাব—মার মতো হোক। এই নৈতিক বোধটা  পরিবার, ধর্মীয় শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই আসতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ‘বার্ধক্য জীবনে সন্তানের করণীয়’ সম্পর্কে নির্দিষ্ট একটা পাঠ্যবিষয় থাকা বাঞ্ছনীয়। এটি তাদের মননে গেঁথে দিতে পারলে সন্তানরা বাবা মা’র প্রতি সদয় থাকাটা দায়িত্ব হিসেবে ভাবতে শিখবে।  

প্রাচীন চীনে শান বংশের উদ্যোগে ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ—বৃদ্ধাদের জন্য পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধাশ্রমে যে খাদ্যসহ আরাম—আয়েশের সকল ব্যবস্থা ছিল, এখনকার গড়ে ওঠা বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে এরকম সুযোগ—সুবিধা অনেকাংশেই নেই। মূলত অসহায় ও গরীব বৃদ্ধদের প্রতি করুণাবোধ ও ব্যবসায়িক ধান্দাবাজী মনোভাব থেকেই এ দেশে এ ধরনের বৃদ্ধাশ্রমের সৃষ্টি বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। পারিবারিক বন্ধনের সাথে জড়িয়ে থাকা আমাদের পরিবার ও সমাজের আবহমান মূল্যবোধের সাথে বৃদ্ধাশ্রমের কনসেপ্টটি একেবারেই খাপ খায় না। তবু যদি দেখাশোনা করার মতো কোন সন্তান না থাকে, বনিবনা না হওয়ার মতো বাস্তব কোন কারণ থাকে, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের মানবিক বোধসম্পন্ন বিত্তবানরা তাদের দায়িত্ব নিতে পারে। সেক্ষেত্রে নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ করে দিতে গড়ে তোলা হোক বৃদ্ধ মা—বাবাদের থাকার উপযোগী বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে আধুনিক, উন্নত ও পযার্প্ত সুযোগ সুবিধাসমৃদ্ধ অবসর নিবাস। একই সাথে সামর্থ্যবান ছেলে সন্তান যেন কোন অজুহাতেই তাদের বৃদ্ধ বাবা—মাকে পরিবার থেকে সরিয়ে দিতে না পারে, তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে না পারে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে। 

লেখকঃ

রাহমান ওয়াহিদ 

কবি, কথাশিল্পী ও কলামিষ্ট 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/176679