লাল কপাল আর চঞ্চল ডানা পরিত্যক্ত জলাশয়ে জলমুরগির সংসার
হাফিজা বিনা : ইটের পর ইট, ধূসর দালানকোঠা আর যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে আচমকাই যেন নেমে এসেছে এক টুকরো গ্রামীণ নীরবতা। বগুড়া শহরের জামিলনগর প্রফেসর পাড়ার একটি জলাশয়ের জলে কচুরিপানার সবুজ গালিচা।
তার ওপর দিয়ে হেলেদুলে হেঁটে বেড়াচ্ছে এক জোড়া চঞ্চল পাখি। তার আশে পাশে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর খুটে খুটে খাবার খাচ্ছে তাদের চারটি ছোট ছানা। কখনো আবার মা পাখিটা ছানাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকেই জীবনে প্রথমবার এই পাখি দেখে মুগ্ধ, তবে অধিকাংশের মনেই প্রশ্ন কালো রঙের, লাল কপালওয়ালা এই পাখিটির নাম কী?
একটু ভালভাবে খেয়াল করলেই দেখা যবে রাস্তার পাশে বাড়ি এবং দোকানের পেছনের জলাশয়ে কচুরিপানার সবুজ গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে একঝাঁক ছোটবড় বিলুপ্তপ্রায় জল মুরগি। এরমধ্যে দুটি পূর্ণবয়স্ক জল মুরগি। তাদের লম্বা পা ফেলে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের এই স্বাধীন বিচরণ প্রকৃতিকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা।
জানা যায়, প্রকৃতির এক দারুণ সৃষ্টি পাতি জলমুরগি। গ্রামবাংলার বিল-ঝিল, হাওর কিংবা লতাপাতায় ঘেরা পুকুরে দেখা যায় এই পাখির। জলচর পাখিদের মধ্যে রূপ আর স্বভাবের কারণে এরা সহজেই সবার নজর কাড়ে। বিলের বুকে লাল-কালোর আল্পনা জলমুরগি দেখতে সাধারণ গৃহপালিত মুরগির চেয়ে কিছুটা ছোট। এদের পুরো শরীর স্লেট-কালো পালকে ঢাকা, যা দূর থেকে দেখতে কুচকুচে কালো মনে হয়।
তবে এদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মাথায়। কপাল থেকে ঠোঁটের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছড়ানো থাকে টকটকে লাল রঙের একটি বর্ম বা 'শিল্ড'। আর ঠোঁটের একদম ডগাটি যেন কেউ সামান্য হলুদ রঙে চুবিয়ে নিয়েছে। ডানার পাশ দিয়ে চলে গেছে একটি নিখুঁত সাদা রেখা, যা সাঁতার কাটার সময় দারুণ দেখায়। এদের লম্বা লম্বা পাগুলো সবুজাভ আভার। হাঁসের মতো পায়ের আঙ্গুলগুলো জোড়া না হলেও, এরা পানিতে চমৎকার সাঁতার কাটতে পারে।
সদাব্যস্ত এক চঞ্চল জলচর জলমুরগিদের অলস বসে থাকতে দেখা মেলা ভার। এরা বিচরণের সময় অনবরত ছন্দ মিলিয়ে মাথা ও লেজ ঝাঁকাতে থাকে। পানির ওপর ভেসে থাকা শ্যাওলা, জলজ উদ্ভিদের কচি পাতা, পোকা-মাকড়, শামুক আর কেঁচো খুঁজে খুঁজে খাওয়া এদের প্রধান কাজ।
স্বভাবগতভাবে এরা কিছুটা লাজুক। সামান্য ডাল ভাঙার শব্দ কিংবা মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই এরা ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। তবে ডাঙ্গার মুরগির মতো এরা কিন্তু ওড়ার চেয়ে জলের ওপর দিয়ে ডানা ঝাপটে দৌড়াতে বেশি পারদর্শী।
সংসার জীবন ও কালো ছানার গল্প বর্ষাকাল এলেই জলমুরগিদের সংসারে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পানির ওপর ভেসে থাকা কচুরিপানা বা নলখাগড়ার ঝাড়ে লতাপাতা দিয়ে এরা বেশ বড়সড় বাসা বাঁধে। এদের দাম্পত্য জীবন বেশ অনুকরণীয়।
স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দুজনে মিলেই ডিমে তা দেয় এবং ছানাদের দেখভাল করে। জলমুরগির ছানাগুলো দেখতে কিন্তু মা-বাবার মতো রঙিন হয় না। ডিম থেকে ফোটার পর এরা পুরোপুরি কুচকুচে কালো লোমে ঢাকা থাকে। জন্মের পর পরই এরা মা-বাবার সাথে পানিতে নেমে পড়ে এবং কচুরিপানার আড়ালে আড়ালে খাবার খুঁজতে শেখে।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'টিম ফর এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (তীর)' দীর্ঘদিন ধরে পাখি সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে আসছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান জানান, শহরের একটি সাধারণ জলাশয়ে জলমুরগি ডিম পেড়ে বাচ্চা ফুটিয়েছে এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর। এর মানে দাঁড়ায়, এখনো শহরের কিছু পকেট-ইকোসিস্টেম বা ছোট জলাশয় বন্যপ্রাণিদের আশ্রয় দিতে সক্ষম। স্থানীয় বাসিন্দারা যে পাখিগুলোকে বিরক্ত করছেন না, এটি প্রশংসনীয়।
তিনি আরও জানান, একসময় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম্য জলাশয়েই জলমুরগি দেখা যেত। কিন্তু দিন দিন জলাভূমি ভরাট, ফসলি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং শিকারিদের উপদ্রবের কারণে এই সুন্দর পাখিটি আজ হুমকির মুখে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং আমাদের জলাভূমিগুলোর সৌন্দর্য ধরে রাখতে এই জলচর পাখিদের বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফাতেমা বলেন, কয়েকদিন ধরেই দেখছি কালো রঙের দুটো পাখি চারটা ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে জলাশয়ের কচুরিপানার ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা তো চিনি না, ভেবেছিলাম কোন অতিথি পাখি হবে। মাঝেমধ্যে এখানে বালিহাঁস ছাড়াও অচেনা পাখি আসে। দু-একদিন থেকে চলে যায়। কিন্তু এই পাখিটা বাচ্চা নিয়ে এখানেই আছে। আমরা কেউ এদের ডিস্টার্ব করি না।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/176599