পাহাড় ধস: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, আমরা কতটা প্রস্তুত

পাহাড় ধস: প্রকৃতির সতর্কবার্তা, আমরা কতটা প্রস্তুত

বাংলাদেশ পাহাড়, সমতলভূমি ও নদ—নদীর অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের কিছু এলাকায় বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল দেশের জীববৈচিত্র্য, কৃষি, পর্যটন ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব অঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খুমি, খিয়াং, পাংখোয়াসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও জীবিকার সঙ্গে পাহাড় ও বনভূমির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ, আদা, হলুদ, আনারস, কলা, তুলা ও বিভিন্ন ফলমূলের আবাদ হয়। অন্যদিকে সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ঘেঁষা চা—বাগান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটককে আকৃষ্ট করে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যে পাহাড় আমাদের প্রকৃতি ও অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি, সেই পাহাড় আজ ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছে। প্রতি বর্ষায় পাহাড় ধসের ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণের ভয়াবহ মূল্য একসময় মানুষকেই দিতে হয়। পাহাড়ধস মূলত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও বর্তমানে এর পেছনে মানবসৃষ্ট কারণই সবচেয়ে বেশি দায়ী। অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ের মাটি পানিতে ভিজে ভারি হয়ে পড়ে এবং মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে নিচের দিকে ধসে যায়। কিন্তু সুস্থ ও বনাচ্ছাদিত পাহাড় সাধারণত সহজে ধসে পড়ে না। পাহাড়ের গাছপালার শিকড় মাটিকে দৃঢ়ভাবে অঁাকড়ে ধরে রাখে এবং বৃষ্টির পানির চাপ কমাতে সহায়তা করে। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, মাটি উত্তোলন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি নির্মাণ পাহাড়কে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক লাভের আশায় পাহাড় কেটে আবাসন, দোকানপাট কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করছে। আবার মূল্যবান কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নির্বিচারে গাছ কেটে বনভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। ফলে পাহাড় তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে এবং সামান্য অতিবৃষ্টিতেই ধসের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। পাহাড় ঘিরে আরসিসি রক্ষাবেষ্টনী ও নালা না থাকায় এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষাকালে পাহাড়ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে বহু মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারান। অনেক পরিবার মুহূর্তের মধ্যে তাদের প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও সহায়—সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। শুধু স্থানীয় মানুষদের প্রাণহানি নয় কখনো কখনো পর্যটকদের অনেকেই মাটি চাপা পড়ে প্রাণ হারায়। পাহাড়ধ্বস শুধু প্রাণহানিই ঘটায় না, এটি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ ব্যাহত করে, কৃষিজমি নষ্ট করে, খাদ্যসংকট তৈরি করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অতীতের ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাস পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও কিছুদিন পর আবারও সেখানে বসতি গড়ে ওঠে। দারিদ্র্য, বিকল্প বাসস্থানের অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যাবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরে চিহ্নিত ২৬টি ঝুকিঁপূর্ণ পাহাড় রয়েছে যেখানে এখনো পর্যন্ত প্রায় ৬৫৫৮টি পরিবার বসবাস করছে। ১৯৫৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী (২০১০ সালে সংশোধিত) দেশে পাহাড় বা টিলা কাটা নিষিদ্ধ হলেও তা বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো বাস্তবায়ন নেই। তাই আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে। তাছাড়াও পাহাড়ধস মোকাবিলায় শুধু দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করলেই হবে না, বরং দুর্যোগের আগেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে, বনভূমি সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আগাম সতর্কবার্তা এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য বিপদের আগেই মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও পাহাড় রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পাহাড় কেবল মাটি ও পাথরের স্তূপ নয়; এটি আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। পাহাড় রক্ষা করা মানে বন, জীববৈচিত্র্য, নদীর উৎস, কৃষি, পর্যটন এবং সর্বোপরি মানুষের জীবন রক্ষা করা। প্রকৃতি বারবার বিভিন্ন দুর্যোগের মাধ্যমে আমাদের সতর্ক করছে যে পরিবেশ ধ্বংসের পরিণতি ভয়াবহ। এখনই যদি আমরা দায়িত্বশীল আচরণ না করি, তবে ভবিষ্যতে পাহাড়ধস আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। তাই সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ জনগণকে সমন্বিত উদ্যোগে পাহাড় রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। কারণ নিরাপদ পাহাড়ই নিরাপদ জীবন, আর প্রকৃতিকে রক্ষা করলেই কেবল আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখতে পারব।

লেখক :

শেখ সুলতানা মীম

শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ (ইংরেজি বিভাগ) 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/175798