মৌসুমি ফলে জমজমাট বাদামতলী
শেখ শাহরিয়ার হোসেন: দেশজুড়ে মৌসুমি ফলের ভরপুর সরবরাহে রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি ফলের বাজার বাদামতলীতে বেড়েছে দেশি ফলের বেচাকেনা। আম, লিচু, কাঁঠাল, জাম ও পেয়ারাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফলের চাহিদা বাড়লেও তুলনামূলকভাবে কমেছে বিদেশি ফলের বিক্রি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশি ফলের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে এখন ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি স্থানীয় ফলের দিকেই।
গতকাল বুধবার বাদামতলী বাজার ঘুরে দেখা যায়, মৌসুমি ফলের প্রাচুর্যে বর্তমানে দেশীয় ফলের বিক্রি সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে হিমসাগর, রত্না, আম্প্রপালি ও বারি ফোর জাতের আম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন এবং ড্রাগন ফলের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের কারণে এসব ফল তুলনামূলক কম দামে এবং সহজে পাওয়া যাচ্ছে, ফলে ক্রেতারা বিদেশি ফলের পরিবর্তে দেশীয় ফল কিনতেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এর প্রভাব পড়েছে আমদানিকৃত মাল্টা, কমলা, আপেল, নাশপাতি ও ডালিমের বাজারে। যদিও এসব ফলের বেচাকেনা অব্যাহত রয়েছে, তবে মৌসুমি দেশীয় ফলের ভিড়ে বর্তমানে বিদেশি ফলের চাহিদা ও বিক্রি কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা বাদামতলী বাজার দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলবাজার হিসেবে পরিচিত। প্রায় শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করা এ বাজারে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের ফলের বেচাকেনা হয় প্রতিদিন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৌসুম ও বাজার পরিস্থিতি ভেদে মৌসুমি ফলে জমজমাট বাদামতলী এখানে প্রতিদিন কয়েক কোটি থেকে শতকোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়ে থাকে। বর্তমানে পাইকারি বাজারে হিমসাগর আম প্রতি কেজি ৫০ টাকা, রত্না আম ৬০ টাকা, বারি ফোর আম ৮০ টাকা, ড্রাগন ফল ১০০ টাকা, মাল্টা ১০০ টাকা, লটকন ১৫০ টাকা, নাশপাতি ১২০ টাকা, কমলা ২২০ টাকা, ডালিম ২২০ টাকা, বড় আপেল ৩৫০ টাকা এবং ছোট আপেল ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলের মান ও উৎসভেদে দামের কিছুটা তারতম্য দেখা যায়।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ফল আসে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। পাশাপাশি মাল্টা, আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি, ডালিম ও খেজুরের মতো বিদেশি ফল আসে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বিভিন্ন স্থলবন্দর হয়ে। এরপর সেগুলো পাইকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, বাদামতলীর কার্যক্রম মূলত ভোর থেকেই শুরু হয়। সকাল হওয়ার আগেই ফলবোঝাই ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করে। এরপর আড়তদার, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের উপস্থিতিতে জমে ওঠে বেচাকেনা। দুপুর পর্যন্ত চলে সবচেয়ে বেশি লেনদেন। বাজারের প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মতে, ব্রিটিশ আমল থেকেই বাদামতলী পাইকারি বাণিজ্যের জন্য পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের আকার ও পরিধি বেড়েছে। একসময় দেশীয় ফলের বেচাকেনা বেশি হলেও বর্তমানে আমদানিকৃত ফলের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে এ বাজার।
বিশ্বের ৪৬টি দেশ থেকে খেজুর, আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর, নাশপাতি ও ডালিমসহ বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি করেন বাদামতলীকেন্দ্রিক আমদানিকারকরা। এসব ফলের বড় অংশ এই বাজারের মাধ্যমে পাইকারি পর্যায়ে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। বাদামতলী ফলবাজারের ব্যবসায়ী এস রহমান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহিন আলম বলেন, “এবার মৌসুমি ফলের চাহিদা অনেক বেশি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। পাইকারি দামে ফল কিনে নিজেদের এলাকায় নিয়ে বিক্রি করেন। ফলের দাম প্রতিদিন পরিবর্তন হয়, কারণ এটি পচনশীল পণ্য।”
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা সমস্যা। ব্যবসায়ীরা জানান, সরু সড়ক ও যানজটের কারণে ফলবোঝাই গাড়ি বাজারে প্রবেশে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়ে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারলে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া আধুনিক সংরক্ষণাগার ও হিমাগারের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় কম।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রন্টস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলেন, ফল আমদানিতে শুল্ক ও বিভিন্ন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। তবুও দেশের ফল সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বাদামতলীর গুরুত্ব এখনো অটুট রয়েছে।
ফল কিনতে আসা ক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন বাজারে দেশীয় ফলের মৌসুম চলছে। আম, লটকন ও লিচু তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে এবং স্বাদও ভালো। তাই বিদেশি ফলের চেয়ে দেশীয় ফলই বেশি কিনছি। পরিবারের চাহিদাও এসব ফলের দিকেই বেশি।”
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/175578