খেলার মাঠে প্রিয় দল হারলে নিজেকে সামলাবেন যেভাবে
প্রথম বাঁশি বাজা থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপ যেন কোটি মানুষের আবেগের উৎসব। প্রিয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখা, প্রতিটি গোলের সঙ্গে আনন্দে ভেসে যাওয়া, সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, অনেকের জীবনের বিশেষ স্মৃতি।
কিন্তু এই আনন্দের মাঝেই আসে হতাশার মুহূর্ত। প্রিয় দল হেরে গেলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় ট্রল, মিম, ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে। অন্যদিকে সরাসরি ও খোঁচা দেয়া হয়। কেউ এগুলো হাস্যরসের অংশ হিসেবে নিলেও, অনেক সমর্থকের কাছে তা মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই দল হারার কষ্টের পাশাপাশি ট্রলও কীভাবে সামলাতে হবে, সেটি জানা জরুরি।
ফুটবল একটি খেলা হিসেবে দেখা
প্রিয় দল হারলে মন খারাপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কারণ একজন সমর্থক বছরের পর বছর ধরে নিজের দলের সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কিন্তু একটি ম্যাচের ফল কখনোই আপনার ব্যক্তিগত সাফল্য বা ব্যর্থতার পরিচয় নয়। ফুটবলের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা। আজ যে দল হেরে গেছে, আগামী টুর্নামেন্টে সেই দলই চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। তাই একটি পরাজয়কে জীবনের বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।
ব্যক্তিগত আক্রমণ না ভাবা
বিশ্বকাপ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও ট্রল প্রায় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। অনেকেই শুধু মজা করার উদ্দেশ্যে এসব পোস্ট করেন। তাই প্রতিটি মন্তব্য বা পোস্টকে নিজের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়। সব মন্তব্যের জবাব দেওয়ারও দরকার নেই। অনেক সময় নীরব থাকাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কিছুটা দূরে থাকা
যদি মনে হয় একের পর এক ট্রল আপনার মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছে বা মানসিক অস্বস্তি বাড়াচ্ছে, তাহলে কয়েক ঘণ্টা বা এক-দুদিনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বিরতি নিন। এই সাময়িক বিরতি আপনার মনকে শান্ত হতে সাহায্য করবে। সব খবর বা মন্তব্য সঙ্গে সঙ্গে জানতেই হবে-এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
হাস্যরস গ্রহণ করার অভ্যাস গড়ে তোলা
সব ট্রলই অপমান করার জন্য তৈরি হয় না। অনেক মিম কেবল বিনোদনের জন্য বানানো হয় এবং উভয় দলের সমর্থকরাই সেগুলো উপভোগ করেন। নিজের দলকে নিয়ে হালকা হাসতে পারা মানসিক পরিপক্বতার পরিচয়। খেলাকে খেলার জায়গায় রাখতে পারলে এসব বিষয় সহজভাবে নেওয়া সম্ভব হয়।
অনলাইন তর্কে না জড়ানো
প্রিয় দলকে সমর্থন করতে গিয়ে অনেকেই মন্তব্যের ঘরে দীর্ঘ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এতে খুব কম ক্ষেত্রেই কারও মতামত বদলায়। বরং সময় নষ্ট হয়, মানসিক ক্লান্তি বাড়ে এবং অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা তৈরি হয়। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দিলে তাকে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
নিজের অনুভূতি অস্বীকার না করা
দল হারার পর মন খারাপ হওয়া, হতাশ লাগা বা কিছুটা কষ্ট পাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। নিজের অনুভূতিকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। তবে সেই হতাশা যেন দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা, চাকরি বা পারিবারিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব না ফেলে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
বাস্তব জীবনের আনন্দে ফিরে যাওয়া
খেলা শেষ হওয়ার পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান, হাঁটতে বের হন, বই পড়ুন বা নিজের পছন্দের কোনো শখের কাজে মন দিন। এতে মন অন্যদিকে ব্যস্ত থাকবে এবং পরাজয়ের হতাশা ধীরে ধীরে কমে যাবে। মনে রাখবেন, ফুটবল জীবনের একটি অংশ মাত্র, পুরো জীবন নয়।
প্রতিপক্ষকে সম্মান করা
কখন ট্রলকে গুরুত্ব দেবেন
সব ট্রল সমান নয়। যদি কোনো মন্তব্য ব্যক্তিগত অপমান, অশ্লীল ভাষা, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা অনলাইন হয়রানিতে পরিণত হয়, তাহলে তা সহ্য করার কোনো প্রয়োজন নেই। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট মিউট, ব্লক বা রিপোর্ট করুন। নিজের মানসিক সুস্থতা যেকোনো অনলাইন বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের আসল আনন্দ শুধু ট্রফি জেতায় নয়, বরং কোটি মানুষের একসঙ্গে খেলা উপভোগ করা, বন্ধুদের সঙ্গে স্মৃতি তৈরি করা এবং ফুটবলের সৌন্দর্যকে উদযাপন করার মধ্যে। তাই প্রিয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি বা অন্য কোনো দল হেরে গেলেও হতাশাকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেবেন না।
একজন সত্যিকারের সমর্থক শুধু জয়ের সময় নয়, কঠিন সময়েও নিজের দলের পাশে থাকেন। মনে রাখবেন, ফুটবলে প্রতিটি হারই নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। আজকের পরাজয়ই হয়তো আগামী দিনের জয়ের প্রেরণা হয়ে উঠবে।
পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/175187