বগুড়ায় ফুটপাত নিয়ে বানিজ্য অভিযানেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি
স্টাফ রিপোর্টার : বগুড়া মহানগরে সিটি কর্পোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান চললেও ফুটপাতের অবস্থা তেমন পাল্টায়নি। আগের মতই ফুটপাত দখলে নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে হকাররা। ফুটপাত নিয়ে বানিজ্যও করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। টাকার বিনিময়ে তারা তাদের দোকানের সামনে ‘ফুটপাতে’র একাংশ হকারদের কাছে ভাড়া দিয়ে বানিজ্য করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দৈনিক করতোয়াকে বলেন, এখন ফুটপাত দখলকারীদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযান চলছে। ফুটপাতে না বসতে হকারদের উদ্দেশ্যে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে আগামী রোববার থেকে পুরোদমে হকার উচ্ছেদ অভিযান চলবে বলে জানান। তিনি আরো বলেন, এক শ্রেণির দোকান মালিক তাদের দোকানের সামনে ফুটপাতের একাংশ হকারদের কাছে ভাড়া দিয়ে ‘বানিজ্য’ করছেন। তারা ফুটপাত ভাড়া দিয়ে দিনে ৩শ’ ও ৪শ’ টাকা নিচ্ছেন বলে তার কাছে তথ্য রয়েছে। তিনি বলেন ফুটপাত হকারমুক্ত করতে সিটি কর্পোরেশন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা বলেও তিনি হুসিয়ারি দেন। সিটি প্রশাসক ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিয়ন্ত্রনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুটপাত নিয়ে বানিজ্য এখন জমজমাট। ফুটপাতের মালিক বগুড়া সিটি করর্পোরেশন। অথচ ফুটপাত নিয়ে বানিজ্য করছেন এক শ্রেণির প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ফুটপাত সংলগ্ন দোকান রয়েছে এমন কিছু ব্যবসায়ী ‘ডবল’ ব্যবসা করছেন এখন। তারা দোকানের সামনে ফুটপাতের অংশ বিশেষ হকারদের ‘ভাড়া’ দেন। অথচ ফুটপাত বগুড়া সিটি করর্পোরেশন এর সম্পত্তি। ফুটপাত ভাড়া দেয়ার অধিকার নেই তাদের। এই ফুটপাত শুধু পথচারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। অথচ ফুটপাত এমনকি রাস্তার একাংশ ভাড়াও দেয়া হচ্ছে। যা এক ধরণের চাঁদাবাজি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার বলেন, ফুটপাতে তিন থেকে ৫ ফুট জায়গার জন্য দোকান মালিকদের তারা প্রতিদিন ২শ’ ও ৩শ’ থেকে ৫শ’ এমনকি একহাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়। সেইসাথে দোকানের সামনে রাস্তার একাংশেরও ভাড়া নেয় ওই দোকান মালিকরাই।
বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ (টিআই, প্রশাসন) মো. সালেকুজ্জামান বলেন, অভিযোগ আছে, টাকার বিনিময়ে এক শ্রেণির দোকান মালিক তাদের দোকানের সামনে ফুটপাতে হকারদের পসরা সাজিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দেন। এজন্য তারা ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত নেন। বিশেষ করে কবি নজরুল ইসলাম সড়কে, থানা মোড়ে, চাঁদনী বাজার ও ফতেহ আলী মোড়ে এসব ঘটনা বেশি ঘটে। বিষয়টি আইন শৃংখলা কমিটির সভায় আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টায়নি। তিনি আরো বলেন, দোকান মালিকরাই যদি তাদের দোকানের সামনে ফুটপাতে হকারদের বসার সুযোগ দেন তাহলে ফুটপাত হকারমুক্ত থাকবে কিভাবে। তিনি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করতে ওই সব ব্যবসায়ীদের আহবান জানান। তবে কবি নজরুল ইসলাম সড়কের একাধিক দোকান মালিক টাকা নিয়ে হকারদের ফুটপাতে বসার সুযোগ করে দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেন।
অপরদিকে, ফুটপাতে হকার উচ্ছেদে সিটি কর্পোরেশনের লোকজন ও পুলিশ নামে,আবার উচ্ছেদ শেষে চলেও যায়, কিন্তু দখলমুক্ত হয়না ফুটপাত। অভিযানে নামলেই সিটি কর্পোরেশনের একশ্রেনির কর্মচারি ও পুলিশের সাথে হকারদের শুরু হয় লুকোচুরি খেলা। উচ্ছেদ অভিযানকালে ফুটপাত থেকে হকাররা সরে যান, আবার তারা ফিরে গেলেই ফুটপাত দখলে নিয়ে পসরা সাজান হকাররা। ফুটপাত নিয়ে লুকোচুরি খেলা চললেও চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারীরা। এই দুর্ভোগের যেন শেষ নেই। শুধু ফুটপাতই নয়, সড়কের একাংশ দখলে নিয়েও পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করে দুর্ভোগ বাড়ান হকাররা। হকারদের কারনে ফুটপাতে পা ফেলতে পারেননা পথচারীরা। গন্তব্যে যেতে বাধ্য হয়ে পথচারীরা নেমে পড়েন রাস্তায়। যে কারনে যানজট বাড়ে মহানগরের বিভিন্ন সড়কে।
ফুটপাত ছাড়াও সড়কের একাংশ দখল করে হকাররা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। সড়কের একাংশে নতুন-পুরাতন কাপড় ভর্তি ভ্যান দাঁড়িয়ে রেখে ব্যবসা চালিয়ে যান হকাররা। এভাবে ভ্যানে করে কাপড় রেখে ব্যবসা করে বেশি লাভবান হওয়ায় এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও ঝুঁকে পড়ছেন এই ব্যবসায়।
পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে যে, মার্কেটে যাদের দোকান আছে এমন একাধিক কাপড় ব্যবসায়ীরা কর্মচারী বা হকারদের ব্যবহার করে এভাবে ব্যবসা করছেন। একাধিক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কর্মচারী বা হকারদের মাধ্যমে দিনে ১০-১২টি করে ভ্যান রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ব্যবসা করছেন। ফলে এতে মহানগরে যানজট বাড়ছে। আরো জানা যায়,মহানগরের সাতমাথায় হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদাও নেয়া হয়। সন্ত্রাসী চক্রের একাধিক গ্রুপ হকারদের কাছ চাঁদা তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়,পুরো সাতমাথা এলাকাসহ মহানগরের চাঁদনী বাজার (কাঠালতলা), ফতেহ আলী মোড়,স্টেশন রোড,রেলওয়ে হকার্স মার্কেটের সামনে, ফলপট্টি,কবি নজরুল ইসলাম সড়ক,নবাববাড়ি সড়ক, সার্কিট হাউজের সামনে, ফুলপট্টি, প্রধান ডাকঘরের সামনে ও পাশে,সাতমাথা শেরপুর সড়কসহ বিভিন্নস্থানে ভ্যানে ফুটপাত ও সড়কের একাংশ হকারদের দখলে চলে গেছে। এসব স্থানে অবৈধভাবে ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে পসরা বিছিয়ে ব্যবসা করছেন হকাররা। ফলে যানজটে নাকাল হচ্ছে সাধারণ মানুষ। যানজটে পড়ে সময় নষ্ট হচ্ছে। ১০ মিনিটের গন্তব্যে যেতে সময় লাগছে একঘন্টা।
এদিকে,সাদ্দাম নামে একজন হকার বলেন, ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে ব্যবসা করা তাদের উচিত নয়। কিন্তু পেটের দায়ে তাদের রাস্তায় নামতে হয়। ফুটপাতে কেনা-বেচা বন্ধ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলে তাদের অন্য স্থানে পুনর্বাসন করতে হবে।
এ বিষয়ে বগুড়া সদর ট্রাফিক বিভাগের ইনচার্জ (টিআই) মোঃ সালেকুজ্জামান খাঁন আরো বলেন ফুটপাত দখলমুক্ত ও যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ সাধ্যমত কাজ করছে। প্রায়ই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ফুটপাতে পুলিশ গেলে পসরা তুলে নিয়ে হকাররা সটকে পড়ছেন আবার পুলিশ চলে গেলে তারা ফুটপাতে বসে পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছেন। তিনি বলেন, ভাল মানের দোকান বা শোরুম আছে এমন ব্যবসায়ীরাও ভ্যানে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেছেন। মহানগরের তিন থেকে চারশ’ ভ্যানে কাপড় ব্যবসা চলছে।তার মতে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হলে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে, গত বুধবার ১ জুলাই থেকে বগুড়া সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে মহানগরের বিভিন্নস্থানে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের সচিব ও নির্বাহি ম্যাজিস্ট্রেট মোছা: পপি খাতুন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছেন।