সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, বগুড়ার ১০১তম প্রতিষ্ঠা দিবস
আজ ১লা জুলাই ২০২৬ ঠিক এমনি এক শুভক্ষণে ১৯২৫ সালের ১লা জুলাই সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা বগুড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ পালন করা হচ্ছে ১০১ তম প্রতিষ্ঠা দিবসের উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন কর্মসূচি। বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ইতিহাসে উত্তরবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বৃটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন প্রতিষ্ঠান বগুড়া সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা। দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠান জ্ঞানের আলো বিতরণ করে আসছে শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিক মূল বোধ বিজ্ঞান ও ধর্মীয় আদর্শের সমন্বয়ে এ মাদ্রাসা উত্তরবঙ্গের মুসলিম সমাজের এক বিশেষ গৌরবোজ্জল স্থানে উপনীত হয়ে আছে।
একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদান করে না এটি একটি সমাজ গড়ে তোলে, একটি প্রজন্মকে আলোকিত করে উদ্ভাসিত করে এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখে। সেই অর্থে বগুড়া সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় বরং উত্তরবঙ্গের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যের অনবদ্য অধ্যায়।
১৭৫৭ সালে পলাশীতে মুসলিম জাতির স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ইংরেজদের অনুমোদনক্রমে ভিত্তি স্থাপিত হয়। সেই আলিয়া নেসাব এর আলোকেই ১৯২৫ সালের ১লা জুলাই বগুড়া সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। বগুড়ার সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের খাঁন বাহাদুর হাফিজুর রহমান চৌধুরী তখনকার সময়ে বিভিন্ন মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সহ বহু জনকল্যাণমূখী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নামকরণ ঃ মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠানলগ্নে কতিপয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম ১৯ উনিশ টাকা দিয়ে সুত্রাপুর এলাকায় সাতানী মসজিদে যাত্রা শুরু করে। পশ্চিম বঙ্গের ফুরফুরার মাওলানা মুস্তফা আল-মাদানী (রহ.) এর নাম প্রস্তাব করে বগুড়ার কতিপয় বিশিষ্ট ঈমানদার দ্বীন দরদী গণ্যমান্য শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে প্রস্তাব অনুসারে “মুস্তাফাবিয়া” নামকরণ করা হয় এবং মাদ্রাসার দাখিল, আলিম, ফাজিল ক্লাসের কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৪৯ সালে হাদীস বিভাগ খোলার পর মাদ্রাসাটির নাম পরিবর্তন করে “মুস্তাফাবিয়া টাইটেল মাদ্রাসা” নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৬৫ সালে তাফসীর বিভাগ চালু করা হলে “মুস্তফাবিয়া ডবল টাইটেল মাদ্রাসা” নামে পরিবর্তিত হয়। মাদ্রাসাটি সরকারিকরণের জন্য ছাত্ররা মিছিল, মিটিং, আন্দোলন ও সংগ্রাম করে প্রতিষ্ঠাটি “সরকারিকরণে সফল হয়। তখন সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা” নামকরণ করা হয় ১২ মার্চ ১৯৮৬ সালে।
সাতানী মসজিদে শুভ সূচনা হওয়ার পর মসজিদ ভিত্তিক পাঠদান চলতে থাকলেও কোন ঘর বা বিল্ডিং ছিল না। পরে মসজিদ সংলগ্ন একটি বেড়ার ঘর নির্মাণ করা হয়। মাদ্রাসটি দাখিল, আলিম, ফাজিল পর্যন্ত উন্নত হওয়ার ১৯৩৮ সালে কলকাতা মাদ্রাসা বোর্ড এর অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভাল ফলাফল করতে থাকে ফলে মাদ্রাসার ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন মাদ্রাসাটির ঘর দরজা বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
১৯৪১ সালে মাদ্রাসার কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক শহরের উপকন্ঠে নামাজগড় কবরস্থানের উত্তর পার্শ্বে নিশিন্দারায় ৪.২৩ একর জমির উপর মুস্তাফাবিয়া মাদ্রাসার বাঁশের বেড়া ও মাটির প্রলেপ দিয়ে টিনের ছাঁদ দিয়ে আধাপাকা ঘর তৈরি করা হয়। সে সময় জমি-দান করেন, নিশিন্দারা সুলতানগঞ্জপাড়া, বৃন্দাবনপাড়া, গোদারপাড়া, কাটনারপাড়া, খলিশা কান্দি, মাটিডালি, জয়পুরপাড়া, ছোট ও বড় কুমিড়া, এরুলিয়া, পাশলা, শিকারপু, ধরমপুর ইত্যাদি মৌজার লোকজন মাদ্রাসাটি নতুন রূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে পাঠদান চলতে থাকে। পরে এটি একটি বহুমূখী মাদ্রাসা পরিচিত হয়। ১৯৫১ সালে মাওলানা আবু নছর মুহাম্মদ নজিবুল্লাহর নেতৃত্বে প্রথম কামিল হাদিস বিভাগের ছাত্ররা কলকাতা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। মাদ্রাসাটি সাধারণ বিভাগের পাশাপাশি ১৯৭৬ সাল থেকে আলিম ও ১৯৭৮ সালে ফাজিল ক্লাসে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। বর্তমানে দাখিল, আলিম ক্লাসে বিজ্ঞান বিভাগ চালু আছে। পরবর্তীতে ফাজিলকে অনার্স ও কামিলকে মাস্টার্স সমমান স্বীকৃতি দেওয়া হলে বর্তমানে আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। দাখিল, আলিম বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।
এ মাদ্রাসাটি উন্নীতকরণে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যে খান বাহাদুর হাফিজুর রহমান চৌধুরী প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। একই পরিবারের যোগ্য উত্তরসূরী পাকিস্তানের শিক্ষা মন্ত্রী হাবিবুর রহমান চৌধুরী তারপর মাহবুবুর রহমান চৌধুরী এই পরিবারের উত্তরসূরী মন্ত্রী মামদুদুর রহমান চৌধুরী সরকারি করণে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন।
মাদ্রাসার প্রথম সেক্রেটারী ছিলেন খন্দকার হাফিজুদ্দিন নাছির সাহেব মুদ্দারিস সাতানী মসজিদের ইমাম নিজামুদ্দিন গজনবী। ১৯৩৮ সালে কলকাতা মাদ্রাসা বোর্ডের মঞ্জুরী লাভের পর প্রথম সরকারিভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বগুড়া নুরুন্নবী চৌধুরী।
প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন মাওলা বখস ১৯৩৭, মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহাব ১৯৪১, আব্দুর রব কাশেমি ১৯৪৮, মাওঃ মোহাম্মদ মোজাম্মেল আলি ১৯৪৯, মাওলানা আঃ নঃ মুঃ নজিবুল্লাহ ১৯৮২ পর্যন্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মাওঃ মুহাম্মাদ আলী ১৯৮২ সালে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। আর নজিবুল্লাহ হুজুরকে রেকটর পদে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সরকারি হওয়ার পর প্রফেসর আঃ নঃ ম. ইমাম উদ্দিন অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মাওলানা তাজাম্মুল হোসেন, মাওলানা ইসহাক আলি, এ.কে.এম আফতাব উদ্দিন, শায়েখ নজরুল ইসলাম, শায়েখ প্রফেসর ডা.আহমুদুল্লাহ ত্রিশালী, বর্তমানে প্রফেসর আব্দুল লতিফ সুচারুরূপে মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। অধ্যক্ষ আ.ন.মু. নজিবুল্লাহ হুজুরের হাতে মাদ্রাসাটি উন্নতির চরম শিখরে পৌছায় এবং মাদ্রাসার খ্যাতি পূর্ব পাকিস্তানের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিষ্ঠানটির হাজার হাজার শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন সেক্টরে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তাদের মধ্যে.... বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডীন প্রফেসর এ্যামিরেটাস, প্রফেসর সুপার নিউমেরারী, ডক্টরেট ভিসি। মাদ্রাসা ও কলেজে অধ্যক্ষ ও শিক্ষক, ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার, বিচার বিভাগের কর্মকর্তা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা (আর্মী, পুলিশ, বিজিবি, সচিব পর্যন্ত), ইসলামি গবেষক,সাংবাদিক, লেখক, কলামিষ্ট, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, সমাজ সেবক, ইসলামী বক্তা, রাজনীতিবীদ ও জনপ্রতিনিধি। অনেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে মাদ্রাসার সাফস্য ও সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছেন। সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা শুধু শিক্ষা প্রদানেই সীমাবদ্ধ নয় এটি সমাজ উন্নয়নে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
১। ধর্মীয় আলোচনা সভা, ২।ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ৩। সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম, ৪। মানবিক সহায়তার কার্যক্রম। ৫। দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণ, ৬। নৈতিকতা ও সামাজিকে সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালনা করছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় সমাজে একটি মর্যদাপূর্ণ ও প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিচিত হয়েছে।
১০১ তম বর্ষে এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক, শিক্ষার্থী, দাতা, কর্মকর্তা কর্মচারী এবং সকল শুভানুধ্যায়ীকে যাদের অবদানে মাদ্রাসাটি আজকে এই গৌরবময় অধ্যায়ে উপনীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আজ ১০১ তম বর্ষে পদাপন করেছে। এক শতাব্দী যাবৎ গৌরবময় পথচলা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তাই প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী শতবর্ষ উদযাপন করতে যাচ্ছে। এটি কেবল একটি উৎসব নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্জনের মূল্যায়ন। এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শুভানুধ্যায়ীদের নতুন মেলবন্ধন সৃষ্টি হবে।
সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, উত্তরবঙ্গের তথা দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইসলামী ঐতিহ্যের এক উজ্জল বাতি ঘর। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মাদ্রাসাটি অসংখ্য জ্ঞানী, গুণী, দেশপ্রেমিক, নৈতিক ও মানবিক মানুষ গড়ে তুলেছে। অতীতের গৌরব বর্তমান সাফল্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে ধারণ করে এ প্রতিষ্ঠান আগামী দিনেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাবে- -এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক:
মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান
প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও জি এস
সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, বগুড়া