কাগজে কমে, বাজারে কমে না কেন

কাগজে কমে, বাজারে কমে না কেন

প্রতি বছর বাজেট আসে, হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব-নিকাশ হয়। খবরের কাগজে বড় বড় হেডলাইন হয় ‘‘জনস্বার্থে অমুক পণ্যের ভ্যাট কমলো, তমুক পণ্যের দাম কমবে।” এই শুনে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষ একটু বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার আশা করে। তারা ভাবে, যাক এবার হয়তো চাল-ডাল-তেলটা একটু কম দামে কেনা যাবে, সন্তানকে ভালো কিছু খাওয়ানো যাবে। কিন্তু পরদিন সকালে কাঁচাবাজারে গিয়ে সেই আশার বেলুন এক সেকেন্ডেই ফুটো হয়ে যায়। বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভ্যাট কমলেও এক টাকার জিনিসের দাম এক পয়সাও কমেনি। অথচ ভ্যাট বাড়ার সামান্য গুঞ্জন শুনলেই রাতারাতি জিনিসের দাম ডাবল হয়ে যায়! এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই যে বাজারের খোলাখুলি দ্বিমুখী আচরণ, এটা কি আমাদের সাধারণ মানুষের কপাল, নাকি একটা মস্ত বড় অন্যায়? 

আমাদের দেশের বাজারে একটা অদ্ভুত তামাশা চলে। ভ্যাট বাড়লে ব্যবসায়ীদের দোকানে থাকা ‘পুরোনো স্টক’ এক সেকেন্ডে শেষ হয়ে যায়, তারা সাথে সাথে নতুন বাড়তি দাম নেয়া শুরু করে। আর ভ্যাট কমলে তাদের সেই পুরোনো স্টক যেন আর ফুরোতেই চায় না! বিক্রেতাদের তখন একটাই চেনা মুখস্থ অজুহাত ”আগের বেশি দামে কেনা মাল, কম দামে বেচলে লোকসান হবে। কি আকর্ষণীয় তাদের যুক্তি! অথচ সাধারণ মানুষ ভালো করেই জানে, আমাদের পুরো বাজার ব্যবস্থা এখন গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী আর সিন্ডিকেটের পকেটে বন্দি। সরকার কর ছাড় দেয় সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য, কিন্তু সেই ছাড়ের কোটি কোটি টাকা সাধারণ মানুষের পকেট পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই মাঝপথে সিন্ডিকেটের পেটে চলে যায়। এটা শুধু ব্যবসায়িক ছল চাতুরি না, এটা সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। এই জুলুম দিনের পর দিন চলার প্রধান কারণ হলো সরকারি নজরদারির চরম উদাসীনতা। মাঝেমধ্যে দু-চারজন খুচরা বিক্রেতাকে ধরে জরিমানা করা হয়, টিভিতে সেই খবরও দেখানো হয়। কিন্তু যারা কারসাজি করে গুদামে টন কে টন মাল লুকিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, সেই আসল অপরাধীদের গায়ে সামান্য আঁচড়টাও লাগে না। এই লোকদেখানো মনিটরিং দিয়ে কোনোদিন বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। আমরা সাধারণ মানুষ আর কাগজের কলমে সস্তা আশ্বাস চাই না, আমরা বাজারের থলিতে তার প্রমাণ দেখতে চাই। 

সরকারের কাছে আমাদের জোরালো আবেদন শুধু ভ্যাট কমানোর ঘোষণা দিয়েই আপনাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেই নির্দেশ বাজারে সত্যি সত্যি কার্যকর হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্বও আপনাদের। সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিন, প্রয়োজনে কোটিপতি কালোবাজারিদের জেলে ভরুন। সাধারণ মানুষের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। চাল কিনতে গিয়ে যদি নুন কেনার টাকা না থাকে, তবে সেই মানুষ বাঁচবে কীভাবে? বেঁচে থাকার এই ন্যূনতম লড়াইয়ে সাধারণ মানুষকে এভাবে বাজারের রাক্ষসদের মুখে ছুড়ে দেবেন না। জনগণের পকেট বাঁচানো এখন আর কোনো অনুরোধ না, এটা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দাবি!। 

লেখক:

আব্দুল্লাহ খান 

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/174605