শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগের ঘোষণা সার্বিয়ার প্রেসিডেন্টের

টানা ১৮ মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচ। একই সঙ্গে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনেরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

শনিবার তিনি এ ঘোষণা দেন।প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ভুসিচের এই ঘোষণা এলো শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশটির উত্তরের শহর নোভি সাদের একটি রেলওয়ে স্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জনের মৃত্যুর পর এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়।

বিক্ষোভকারী, বিরোধী দল এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, রেলওয়ে স্টেশনের এই বিপর্যয়টি নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে সরকারের ব্যাপক অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিরই একটি প্রমাণ।

রাজধানী বেলগ্রেডে সরকারপন্থিদের এক সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভুসিচ বলেন, ‘আমি আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ প্রেসিডেন্ট থাকব এবং তারপর পদত্যাগ করব।’

২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভুসিচের দ্বিতীয় এবং শেষ মেয়াদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ভুসিচ জানান, তিনি তার সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টিকে (এসএনএস) আসন্ন প্রেসিডেন্ট এবং আগাম সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হতে সাহায্য করবেন। এই সংসদীয় নির্বাচনও মূলত ২০২৭ সালে হওয়ার কথা ছিল।

তিনি বলেন, ‘আমার প্রস্তাব হলো আসন্ন নির্বাচনে আমাদের যে বিজয়ী তালিকা থাকবে, সেটির নাম হবে ‘ইউনাইটেড সার্বিয়া’।’ তবে তিনি ঠিক কবে পদত্যাগ করবেন বা কবে সংসদ ভেঙে দেবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি। আগাম সংসদীয় নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে দেওয়া একটি পূর্বশর্ত।

এটি ভুসিচের শেষ নয়

পদত্যাগ করলেও ভুসিচ রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নিচ্ছেন না বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ তার দল সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হলে এই পদত্যাগ তার আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ সুগম করতে পারে। সার্বিয়ায় এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রবণতা যে, পদবি যাই হোক না কেন, ক্ষমতা ভুসিচের হাতেই থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভুসিচ তার কোনো সহযোগীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানোর চেষ্টা করবেন, যাতে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারেন।

ওয়ারশ-ভিত্তিক বিশ্লেষক রাদিভোজে গ্রুজিচ বলেন, ‘এটি মোটেও ভুসিচের রাজনৈতিক শেষ নয়। তার কাছে ইতোমধ্যেই একটি পরিকল্পনা রয়েছে, যার মানে নিশ্চিতভাবেই এই নয় যে তিনি রাজনৈতিক অবসরে যাচ্ছেন, বরং এর উল্টোটা।’

তবুও, শনিবারের এই ঘোষণার সময়টি ইঙ্গিত করে যে, ২০০০ সালে স্লোবোদান মিলোসেভিচের পতনের পর থেকে হওয়া সবচেয়ে বড় এই ধারাবাহিক বিক্ষোভের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। কয়েক দিন আগে নোভি সাদ শহরে শিক্ষার্থীরা ওই দুর্ঘটনার শিকারদের স্মরণ করে আগাম সাধারণ নির্বাচনের দাবি জানায়। 

রোববার সার্বিয়ার দক্ষিণ-কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ক্রালজেভো শহরে আরেকটি ছাত্র সমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কর্মী এবং বিরোধীদল উভয় পক্ষই জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে ভুসিচ এবং এসএনএস-কে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায়। স্টুডেন্ট অপজিশন মুভ-চেঞ্জ আন্দোলনের প্রধান সাভো মানোজলোভিচ বলেন, ‘পদত্যাগ এবং আগাম প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ভুসিচ তার অনিবার্য পতনকে ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। কারণ বিক্ষোভ এবং ছাত্র আন্দোলনের প্রতি এখন তার চেয়েও বেশি মানুষের সমর্থন রয়েছে।’

আবারও প্রধানমন্ত্রী?

সার্বিয়ায় প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক, তবে ভুসিচ তার দল এবং সরকারের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তিনি ইতোমধ্যেই আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ধারণার কথা প্রকাশ করেছেন এবং সম্প্রতি তার বেশ কয়েকজন শীর্ষ সহযোগীও জনসমক্ষে বলেছেন যে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত।

গত ফেব্রুয়ারিতে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভুসিচ বলেছিলেন যে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি কী করবেন তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন, তবে দলীয় রাজনীতিতে ফিরে আসা বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তিনি উড়িয়ে দেননি।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিতে কম জড়িত হতে চাই বা একেবারেই হতে চাই না, তবে আমার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের যত্ন নেওয়ার জন্য এক ধরণের সম্পৃক্ততার প্রয়োজন হতে পারে, দেখা যাক কী হয়।’

তীব্র গরমের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে ভুসিচ তার সমর্থকদের বলেন, শিক্ষার্থী এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা দেশ ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে নেমেছে।

তিনি তাদের নাম না জানা বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশেরও অভিযোগ তোলেন, যদিও বিক্ষোভকারীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভুসিচ বলেন, ‘হাজার এবং প্রথম বারের মতো আমরা আপনাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি। আপনারা যা করেছেন আমরা তার সবকিছু ক্ষমা করে দিচ্ছি, তবে আমরা বোকা নই এবং গত এক বছরে দেশের সঙ্গে যা করা হয়েছে তা আমরা ভুলে যাব না।’

সার্বিয়া : রাশিয়া এবং ইইউ-এর মাঝামাঝি

সার্বিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের একটি প্রার্থী দেশ, কিন্তু একই সঙ্গে রাশিয়ার ও চীনের সঙ্গে বেলগ্রেডের জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার পুরোটা সময় জুড়েই ভুসিচকে এই দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়েছে।

ইইউ-তে যোগদানের আগে সার্বিয়াকে অবশ্যই তার আইনের শাসন উন্নত করতে হবে, যার মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি এবং দুর্নীতি ও সংগঠিত অপরাধের নির্মূল করা অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া ব্লকের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির মিল রাখতে হবে।

শনিবার ভুসিচ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার দল দুর্নীতি দূর করবে। তিনি পেনশন বৃদ্ধি, দরিদ্রদের জন্য আর্থিক বরাদ্দ এবং সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতিরও প্রতিশ্রুতি দেন। তবে বিরোধী নেতারা ভুসিচ এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সহিংসতা, ব্যাপক দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করার অভিযোগ এনেছেন। ভুসিচ এবং তার সহযোগীরা অবশ্য এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।

সূত্র: সিএনএন

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/174170