মুহাররম মাসে করণীয়-বর্জনীয়
হিজরি সনের ১ম মাস মহররম মাস। “মুহাররমুল হারাম” বলা হয়েছে আরবী বছরের বা হিজরি সালের প্রথম মাস। অর্থাৎ সম্মানীত মুহাররম মাস। আল্লাহ যে চারটি মাসকে সম্মানীত করেছেন তার মধ্যে মহররম মাস রয়েছে। আগের উম্মতের জন্য সবচেয়ে সম্মানী রোজা ছিল এই মাসের রোজা। একে আশুরার রোজা বলে। ফরজ রোজার পরে তাদের নিকট সবচেয়ে দামী ছিল আশুরার রোজা। আর আমাদের জন্য ফরজ রোজার পর নফল রোজার মধ্যে সবচেয়ে দামী হলো আরাফার রোজা। আশুরার রোজা রাখার কারণে পিছনের জিন্দেগীর এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। ইহুদীরা, বলে আশুরার রোজা মুসা (আ.) এর যুগ থেকে, আসলে তা নয়। আর মুসলমান নামধারী শি’য়া যারা তারা বলে বেড়ায় আশুরার সম্মানী ইমাম হুসাইন (রা.) এর সময় থেকে। এই শি’য়াদের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সমাজের সরলমনা কিছু মুসলমান তাই বিশ্বাস করে বসে আছে। তাদের ধারণা এই দিনে ইমাম হুসাইন (রা.) শহিদ হয়েছেন। তাই এই দিনের এত মর্তবা। অথচ আশুরার ফজিলত শুরু হয়েছে আদম (আ.) এর যুগ থেকে। আগেই বলা হয়েছে আগের উম্মতের জন্য এই দিনের রোজা রাখা অনেক দামী এবং আমাদের নবীজী (সা.) এই মাসের মর্তবার ব্যাপারে ইমাম হুসাইন (রা.) এর শহিদ হওয়ার আগেই বলে গেছেন। সুতরাং যদি এভাবে বলা হয যে, এই দিনটি আগ থেকেই দামী আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, শহিদদের সর্দার ইমাম হুসাইন (রা.) এর মর্যাদা আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তাঁর শহিদের জন্য এই দিনটি পছন্দ করেছেন। এতে এক দিকে যেমন সঠিক কথা বলা হলো এবং অপর দিকে ইমাম হুসাইন (রা.) এর সম্মানকে মানুষের নজরে আরো উঁচু করে তুলে ধরা হলো।
আশুরা: তাৎপর্য, ফযীলত, করণীয় ও বর্জনীয়
তাৎপর্যঃ আশুরা মহররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয়। ইসলাম ধর্ম এই দিবসটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এই দিনে ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছে। যেমন-হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এতে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে যে, একদা নবী করিম (সা.) ইয়াহুদীদের কতিপয় এমন লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, যারা আশুরার দিনে রোজা রেখে ছিল। নবী করিম (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন এটা কিসের রোজা? উত্তরে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ তা’আলা হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছিলেন এবং ফিরআউনকে দল-বল সহ নিমজ্জিত করেছিলেন। আর এই দিনেই হযরত নূহ (আ.) এর কিশতী যুদি পাহাড়ে স্থির হয়েছিল। এই দিনে হযরত নূহ (আ.) ও হযরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতা স্বরুপ রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোজা রাখি। তখন নবী করিম (সা.) বললেন, মুসা (আ.) এর অনুসরণের ব্যাপারে এবং এই দিনে রোজা রাখার ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার। অতঃপর নবীজী (সা.) সে দিন (আশুরার দিন) রোজা রাখেন এবং সাহাবাদেরকেও রোজা রাখতে আদেশ করেন। (বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)।
ফযীলত: হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন-আমি আশাবাদী যে, আশুরার দিনের রোজার ওসিলায় আল্লাহ তা’আলা অতীতের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (তিরমিযি)
করণীয়: ১। আশুরার দিনের রোজা রাখা। তবে এর সাথে ৯ বা ১১ তারিখে মিলিয়ে রাখা। কারণ নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন-তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখ। তবে এক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করতঃ তোমার আশুরার পূর্বে অথবা পরে একদিন সহ রোজা রাখবে। মুসনাদে আহমদ) ২। দ্বীনের খাতিরে এই দিনে হযরত হুসাইন (রা.) যে ত্যাগ তিতিক্ষা প্রদর্শন করেছেন তা থেকে সকল মুসলমানের দ্বীনের জন্য যে, কোনো ধরনের ত্যাগ ও কুরবানী পেশ করার শিক্ষা গ্রহণ করা। ৩। এই দিনে বেশী বেশী তাওবা ইস্তগফার করা দরকার।
বর্জনীয়: ১। তাযিয়া বানানো অর্থাৎ হযরত হুসাইন (রা.) এর নকল কবর বানানো এটা বস্তুত একধরনের ফাসিকী, শিরকী কাজ। কারণ মুর্খ লোকেরা হযরত হুসাইন (রা.) এতে সমাসীন হন এই বিশ্বাসে এর পাদদেশে নজর-নিয়াজ পেশ করে, এর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, এর দিকে পিঠ প্রদর্শন করাকে বেয়াদবী মনে করে, তা’যিয়া দর্শনকে যিয়ারত বলে আখ্যা দেয় এবং নানা রকমের পতাকা ও ব্যানার টানিয়ে মিছিল করে যা সম্পূর্ণ না জায়েজ ও হারাম। (ইমদাদুল ফতুয়া, ফতুয়ায়ে রহিমীয়) ২। মর্সিয়া বা শোক গাঁথা পাঠ করা। এর জন্য মজলিশ করা এবং তাকে অংশগ্রহণ করা সবই না-জায়েজ। ৩। হায়! হুসাইন, হায়! আলী! ইত্যাদি বলে বলে বিলাপ মাতন করা এবং ছুরি মেরে নিজের বুক ও পিঠ থেকে রক্ত বের করা। এগুলো করনিওলা, দর্শক ও শ্রোতা উভয়ের প্রতি নবী করিম (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাজা) ৪। কারবালার শহিদগণ পিপাসার্ত অবস্থায় শাহাদৎবরণ করেছেন। তাই তাদের পিপাসা নিবারণের জন্য বা অন্য কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এই দিনে লোকদেরকে পানি ও সরবত পান করানো। ৫। হযরত হুসাইন (রা.) এর নামে ছোট বাচ্চাদেরকে ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষা করানো এটা করিয়ে মনে করা যে, এই বাচ্চা দীর্ঘায়ু হবে এটাও মহররম বিষয়ক কু-প্রথা ও বিদআত। ৬। তা’জিয়ার সাথে ঢাক-ঢোল অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো (সুরা লোকমান) ৭। শোক প্রকাশ করার জন্য কালো ও সবুজ রঙের বিশেষ পোশাক পরিধান করা। (ফতুয়ায়ে রহিমীয়া) আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে শিরক, বিদআত ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক :
মাওঃ ডাঃ শফিকুল ইসলাম মীর
ইমাম ও খতীব,
কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ বৃন্দাবনপাড়া, বগুড়া।
মুহতামিম
দাঃ ইঃ আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) নূরানী মাদ্রাসা দঃ বৃন্দাবনপাড়া,বগুড়া