লোকাল ট্রেনে যেন নরকযন্ত্রণা

লোকাল ট্রেনে যেন নরকযন্ত্রণা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল পৌনে আটটা। প্ল্যাটফর্মে তিল ধারণের জায়গা নেই। চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত তরুণ-তরুণী, মধ্যবয়সী চাকুরিজীবী আর সাধারণ মানুষ। দূর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা যেতেই প্ল্যাটফর্ম জুড়ে শুরু হলো এক টানটান উত্তেজনা। ট্রেনটি এসে থামার আগেই শুরু হয়ে গেল কামরায় ওঠার মরিয়া চেষ্টা। জানালা দিয়ে ব্যাগ ছুড়ে মারা, চলন্ত ট্রেনের হাতল ধরে ঝুলে পড়া কিংবা একে অপরকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢোকার এই দৃশ্য কোনো যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে কম নয়। এটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীগামী সকাল ৮টা এবং ১০টার লোকাল ট্রেনের প্রতিদিনের চেনা চিত্র। এখানে প্রতিদিন সকালে প্রতিটি যাত্রীকে স্রেফ একটি আসনের জন্য, কিংবা একটুখানি দাঁড়ানোর জায়গার জন্য লড়তে হয় এক নির্মম যুদ্ধে। এই রুটের ট্রেনের প্রধান যাত্রী মূলত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, পড়াশোনার তাগিদে প্রতিদিন তাদের এই পথটুকু পাড়ি দিতে হয়। এদের পাশাপাশি আছেন বহু সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ রোগাক্রান্ত মানুষ, যাদের প্রতিদিনের জীবিকা ও জীবন এই ট্রেনটির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বগি ও আসন সংখ্যা এতটাই অপ্রতুল যে, সাধারণ মানুষের এই যাতায়াত এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। 

ট্রেনের ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অমানবিক দৃশ্য। যেখানে একটি আসনে ৪ জনের বসার কথা, সেখানে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে ৬ থেকে ৭ জনকে। আর যাদের কপালে সিট জুটছে না, তাদের পুরো পথ দাঁড়িয়ে যেতে হচ্ছে। দুই বগির মাঝখানের সংযোগস্থল, টয়লেটের সামনে, এমনকি ট্রেনের দরজায় বাদুড়ঝোলা হয়ে ঝুলছেন মানুষ। সাধারণ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। এই দুই ঘণ্টা দমবন্ধ করা পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা যে কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এর ওপর যদি লাইনে কোনো ‘ক্রসিং’ পড়ে, তবে ট্রেনের ভেতরেই আটকা পড়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে এই ভোগান্তি রূপ নেয় নরকযন্ত্রণায়। এই সিট সংকট এবং গাদাগাদি শুধু শারীরিক কষ্টই বাড়াচ্ছে না, বরং প্রতিদিন ট্রেনের ভেতর তৈরি করছে চরম সামাজিক অস্থিরতা। আগে ওঠার প্রতিযোগিতা, গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসা বা দাঁড়ানো নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে নিত্যদিন চলছে ঝগড়া, গালিগালাজ, এমনকি হাতাহাতি। ট্রেনের দরজায় ঝুলে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। পা পিছলে পড়ে যাওয়া বা স্টেশনের খুঁটির সাথে ধাক্কা লাগার মতো মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন যাত্রীরা। যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে যাওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। 

সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা। একজন শিক্ষার্থী যখন সকালবেলা এই রকম একটা পৈশাচিক যুদ্ধ জয় করে, দুই-তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে, মানসিক ও শারীরিকভাবে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে রাজশাহীর ক্লাসরুমে পৌঁছায়, তখন তার আর পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। মেধার বিকাশ ঘটার বদলে প্রতিদিনের এই ধকল তাদের ঠেলে দিচ্ছে এক গভীর অবসাদের দিকে। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলোর শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিদিন যাতায়াতের পেছনেই তাদের সমস্ত শক্তি ও মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলে, তবে তা পুরো জাতির জন্যই এক বড় ক্ষতি। রেলওয়েকে বলা হয় গণমানুষের বাহন। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী রুটের এই লোকাল ট্রেন দুটির দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকারটুকুও উপেক্ষিত। অথচ কর্তৃপক্ষ চাইলে খুব সহজেই এই রুটের যাত্রী সাধারণের ভোগান্তি লাঘব করতে পারে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভুক্তভোগী ছাত্রসমাজ, চাকুরিজীবী ও সর্বস্তরের জনগণের এখন একটাই বিনীত ও জোর দাবি অবিলম্বে সকাল ৮টা ও ১০টার এই দুটি লোকাল ট্রেনে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা হোক। পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা করে এই রুটের যাতায়াতকে নিরাপদ ও মানবিক করে তোলা হোক। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কি এই হাজারো শিক্ষার্থীর চোখের ক্লান্তি আর সাধারণ মানুষের আর্তনাদ আমলে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? নাকি এই নরকযন্ত্রণা ও নিত্যদিনের জীবনযুদ্ধই এখানকার মানুষের নিয়তি হয়ে থাকবে- এই প্রশ্ন এখন চিল্লাইয়া কাঁদছে উত্তরের এই রেলপথে। 

লেখক :

হালিমা আক্তার হানী

শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ 

পোস্ট লিংক : https://www.dailykaratoa.com/article/174056